কুমিল্লাশুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাহাড়ি জনপদে ‘বন্ধুদের হাসপাতাল’: ৬০ চিকিৎসকের সেবায় একদিনেই চিকিৎসা পেল ৫ হাজার মানুষ

প্রতিবেদক
Cumilla Press
মে ১৫, ২০২৬ ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের প্রান্তিক জনপদে শুক্রবার যেন গড়ে উঠেছিল এক দিনের পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। পাহাড় ঘেরা দুর্গম এলাকায় ৬০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী স্বাস্থ্যসেবায় বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ঔষধ, ফলজ-বনজ গাছের চারা এবং নতুন পোশাক।

লালমাই উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের বড় ধর্মপুর এলাকার মকবুল টিলায় এই স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করে এসএসসি ২০০২ ও এইচএসসি ২০০৪ ব্যাচের বন্ধুরা। পাহাড়ি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আয়োজিত এই ক্যাম্পে ৭০টি বুথে বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবা দেন।

সকাল থেকেই পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের দীর্ঘ সারি দেখা যায় ক্যাম্প এলাকায়। চোখ, ডায়াবেটিস, অর্থোপেডিক্স, নাক-কান-গলা ও গাইনি বিভাগের বুথগুলোতে ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর পাশের বুথ থেকেই রোগীরা সংগ্রহ করেন বিনামূল্যের ঔষধ। পরে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় গাছের চারা ও নতুন পোশাক।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য অধ্যাপক সায়মা ফেরদৌস বলেন, পাহাড়ি ও প্রান্তিক মানুষের জন্য এমন আয়োজন সত্যিই অনুকরণীয়। যেখানে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোই কঠিন, সেখানে এত বড় পরিসরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ বিরল উদ্যোগ। এ অঞ্চলে অব্যবস্থাপনার কারণে হামের মতো রোগে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আয়োজনের আহ্বায়ক ডা. কমরুল ইসলাম মামুন বলেন, আমাদের প্রয়াত বন্ধুদের স্মরণে এই ব্যতিক্রমী হাসপাতাল আয়োজন করা হয়েছে। বড় ধর্মপুর, মঙ্গলমুড়া, রতনপুর, শিবপুর, চন্ডীপুর, দুতিয়াপুর ও দত্তপুরসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে যেসব বিভাগ থাকে, তার প্রায় সব সেবাই এখানে রাখা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।

চিকিৎসা নিতে আসা বড় ধর্মপুর গ্রামের আবদুল কাদের বলেন, অনেকদিন ধরে চোখে ঝাপসা দেখতাম। শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য ছিল না। এখানে চোখ পরীক্ষা করে ঔষধ দিয়েছে। খুব উপকার হলো।

রতনপুর গ্রামের গৃহবধূ রোজিনা আক্তার বলেন, শরীরে এলার্জির সমস্যা ছিল। চুলকানি আর দাগের কারণে অনেক কষ্ট পেতাম। ডাক্তার ভালোভাবে দেখে ঔষধ দিয়েছে, কীভাবে চলতে হবে তাও বুঝিয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলমুড়া এলাকার বৃদ্ধ কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, হাঁটাচলায় শরীরে অনেক ব্যথা ছিল। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ পেয়েছি। গ্রামের গরিব মানুষদের জন্য এমন ক্যাম্প অনেক দরকার।

গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মনিকা ইসলাম বলেন, অনেক নারী দীর্ঘদিনের সমস্যার কথা প্রথমবার চিকিৎসকের কাছে খুলে বলেছেন। গ্রামের নারীরা সাধারণত লজ্জায় চিকিৎসা নিতে আসেন না। এখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পেরেছেন।

দিনশেষে পাহাড়ি জনপদে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি করেছে স্বস্তি ও আশার আলো। অনেকের ভাষায়, এটি ছিল শুধু স্বাস্থ্য ক্যাম্প নয়, মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।