কুমিল্লাশনিবার, ১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাতের কুমিল্লা যেন ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্য!

প্রতিবেদক
Cumilla Press
মে ১৬, ২০২৬ ১২:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কুমিল্লা নগরীতে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। গভীর রাতে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন থেকে নামা যাত্রী থেকে শুরু করে ভোরে কাজে বের হওয়া শ্রমজীবী মানুষ; কেউই এখন আর নিরাপদ নন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নিয়মিত টহল ও অভিযান চললেও অপরাধ থামছে না। আর অপরাধ বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়া ও মাদকের টাকার জোগান দিতেই বাড়ছে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।

দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অটোরিকশার যাত্রীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় টাকা, মোবাইল ও ব্যাগ। ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া

দূরপাল্লার বাস থেকে নামছেন যাত্রীরা। কারও হাতে লাগেজ, কারও চোখে ক্লান্তি। দিন শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার তাড়াহুড়ো সবার মধ্যেই। কিন্তু শহরের অন্ধকারে তখন অন্য হিসাব কষছে ছিনতাইকারীরা। কে একা, কার হাতে ব্যাগ, কে দুর্বল; সবকিছুর ওপরই নজর রাখছে ছিনতাইকারী চক্র। এতে কুমিল্লায় রাত মানেই এখন ছিনতাইয়ের আতঙ্ক।

মাসখানেক আগের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কুমিল্লা নগরীর নির্জন সড়কে চলন্ত একটি অটোরিকশার পথ আটকে দেয় আরেকটি অটোরিকশা। এরপর দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শুরু হয় ভয়ংকর তাণ্ডব। চিৎকার করার আগেই যাত্রীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় টাকা, মোবাইল ও ব্যাগ। মুহূর্তেই অন্ধকারে মিলিয়ে যায় অপরাধীরা।

গত ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকা থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশ। তিনি ট্রেনিং শেষে চট্টগ্রাম থেকে বাসায় ফিরছিলেন। বাস থেকে নামার পরই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রাত শেষ হলেও আতঙ্ক শেষ হয় না। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজে বের হন শ্রমিক, চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীরা। কেউ সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে ছুটছেন, কেউ কিস্তির টাকা জোগাড়ে। কিন্তু সেই ভোরও এখন নিরাপদ নয়। ফাঁকা সড়ক আর কম মানুষের সুযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে ছিনতাইকারীরা।

ট্রেনে আসা বিপ্লব নামে এক যাত্রী বলেন, রাতে কুমিল্লার অলিগলিতে ব্যাপকভাবে ছিনতাই বাড়ছে। নিরাপদে বাসায় ফিরব; এই নিশ্চয়তা নেই। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নিরাপদ না, সেখানে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ-এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

মিশুক চালক বাবুল মিয়া বলেন, কিছুদিন আগে যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। রাতের শহর এখন কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

তবে কেন বাড়ছে এই অপরাধ; এর উত্তর খুঁজতে সময় সংবাদের টিম কথা বলে সাজা খেটে সদ্য মুক্তি পাওয়া কয়েকজন যুবকের সঙ্গে। তাদের দাবি, অনলাইন জুয়া ও মাদকই এখন ছিনতাই বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। মোবাইলের স্ক্রিনে শুরু হয় টাকার নেশা, এক রাতে লাখ টাকা জেতার স্বপ্ন দেখায় জুয়ার অ্যাপস। কিন্তু হারতে হারতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে অনেকে। এরপর শুরু হয় মাদকের নেশা।

সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লায় সহজেই মিলছে নানা ধরনের মাদক। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণদের একটি অংশ। আর সেই মাদকের টাকার জোগান দিতেই তারা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে।

একটির পর একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ধরা পড়ছে সিসিটিভিতে। রাতভর পুলিশের টহল চললেও থামছে না অপরাধ। একাধিক টহল টিম কাজ করলেও অপরাধীরা কৌশল পরিবর্তন করছে। কুমিল্লা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইসতিয়াক হাসান আমিন জানান, গত তিন মাসে ৩০টি মামলায় পঞ্চাশের বেশি ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিয়মিতভাবে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টহল টিম কাজ করছে।

ইতিহাসবিদ আহসানুল কবির সময় সংবাদকে বলেন, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক অবক্ষয়, অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিস্তার তৈরি করছে নতুন অপরাধ প্রজন্ম। গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। এতে নগরজুড়ে বাড়ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা।

রাতের অন্ধকার পেরিয়ে ভোর হলেও আতঙ্ক থামছে না। অনলাইন জুয়া ও মাদকের টাকার জোগান দিতেই বাড়ছে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ। এখন নগরবাসীর অপেক্ষা; অপরাধীদের নয়, সাধারণ মানুষের জন্য কবে নিরাপদ হবে এই শহর।

.