নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস সাক্ষী হয়েছিল লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম অন্ধকার ও যন্ত্রণাময় এক রাতের। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে চিলির বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে টানা চতুর্থ ফাইনাল হারের স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি।
কান্নায় ভেঙে পড়া মেসি ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘সব শেষ। এটা আমার জন্য নয়।
কিন্তু ঠিক ১০ বছর পর, ২০২৬ সালের এই জুলাইয়ে, সেই একই স্টেডিয়ামে ফিরছেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ১০ নম্বর জার্সিধারী। এবার লক্ষ্য; টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় এবং আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের পঞ্চম আন্তর্জাতিক শিরোপা উঁচিয়ে ধরে ট্র্যাজেডির সেই মাঠেই এক সোনালী অধ্যায়ের ইতি টানা।
বার্সেলোনার হয়ে সাফল্যের চূড়ায় থাকলেও, ২০১৬ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির প্রাপ্তির খাতা ছিল শূন্য। ২০০৭ ও ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ক্ষত নিয়ে ২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।নির্ধারিত সময়ের গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে মেসির শট চলে যায় বারের ওপর দিয়ে। বন্ধু সের্হিও আগুয়েরোর সান্ত্বনাও সেদিন মেসির চোখের জল থামাতে পারেনি।
সেদিন ম্যাচ শেষে মেসি বলেছিলেন, ‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি। আর্জেন্টিনার হয়ে একটা শিরোপা না জেতার কষ্ট আমার চেয়ে বেশি আর কারও নয়। কিন্তু এটাই বাস্তবতা, ভাগ্য সহায় ছিল না। আমি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জাতীয় দল আমার জন্য এখানেই শেষ।’
আজ আর্জেন্টিনার মানুষ মেসিকে ঈশ্বরের আসনে বসালেও, সে সময় দেশের এক শ্রেণির সমর্থক তাকে ‘ঠান্ডা মাথার অপদার্থ’ বলে গালি দিত। স্পেনে বেড়ে ওঠার কারণে তিনি আর্জেন্টিনার জার্সি মন থেকে পরেন না; এমন কথাও শুনতে হয়েছিল তাকে। ২৩ বছরের শিরোপা খরা ঘোচানোর সব চাপ তখন ১৫ বছরের এক কিশোরকেও ছুঁয়ে গিয়েছিল। সেই কিশোরটি আর কেউ নন, আজকের আর্জেন্টিনা দলের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা এনসো ফের্নান্দেস।
আরাধ্য নায়কের বিদায় মেনে নিতে না পেরে ১৫ বছর বয়সী এনসো ফেসবুকে এক খোলা চিঠি লিখেছিলেন মেসিকে, ‘আমরা আপনাকে কীভাবে বোঝাব যে আপনার বিদায়ের কষ্টে আমরা কতটা মৃতপ্রায়? আমরা আপনাকে কীভাবে বোঝাব যে আপনি কাঁধে যে চাপ বয়ে বেড়ান, তার ১ শতাংশও আমাদের জীবনে নেই? লিওনেল, আপনি যা চান তা-ই করুন, তবে দয়া করে থেকে যাওয়ার কথা ভাবুন। শুধু মাঠে একটু আনন্দ পাওয়ার জন্য হলেও থাকুন, যা এই মানুষগুলো আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। ছোটবেলায় নিশ্চয়ই দেশের হয়ে খেলে আনন্দ পাওয়ার স্বপ্নই দেখেছিলেন। আপনাকে এই আকাশী-সাদা জার্সিতে দেখাটাই আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গর্ব। শুধু আনন্দের জন্য খেলুন লিও, কারণ আপনি যখন আনন্দ পান, আমরা কতটা আনন্দিত হই তা আপনার ধারণা নেই। আপনাকে ধন্যবাদ এবং ক্ষমা করবেন।’
এনসোর সেই চিঠি মেসির কাছে পৌঁছেছিল কি না তা জানা যায়নি, তবে তৎকালীন কোচ এদগার্দো বাউসার সঙ্গে আলোচনার পর মাত্র দেড় মাসের মাথায় অবসরের সিদ্ধান্ত ভেঙে জাতীয় দলে ফেরেন মেসি। তবে আর্জেন্টিনার ভাগ্যের চাকা ঘোরে ২০২১ সালে, মারাকানায় ব্রাজিলের বিপক্ষে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে।
সেই এক জয় আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বদলে দেয় পুরোপুরি। এরপর একে একে ফিনালিসিমা, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা; টানা চারটি বড় শিরোপা ঘরে তোলে স্কালোনির দল। যে মেসিকে একসময় দুয়ো দেওয়া হতো, তিনিই হয়ে ওঠেন দিয়েগো মারাদোনার সমকক্ষ দেশের ইতিহাসের মহানায়ক।
১০ বছর পর মেসি যখন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে হাঁটবেন বা মাঠে পা রাখবেন, তখন তার মাথায় কী চলবে তা হয়তো জানা যাবে না। কিন্তু ফুটবল দেবতা যেন তার শেষ বিশ্বকাপের জন্য একদম নিখুঁত এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছেন।
আজ রোববার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। মেসির সামনে সুযোগ ১০ বছর আগের সেই অভিশপ্ত মাঠেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে সব ভূত তাড়িয়ে দেওয়ার। আবার উল্টো পিঠে রয়েছে আরেকটি বিশ্বকাপ রানার্স-আপ হওয়ার শঙ্কাও। মেটলাইফের সেই কান্নার রাত কি এবার উল্লাসের রাতে রূপ নেবে? উত্তর দেবে সময়।












