ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বেলেছেন, যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন নৃশংস এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। দণ্ড ঘোষণার আগে বিচারক ঘটনাটি নিয়ে ওই পর্যবেক্ষণ দেন।
পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আদালত বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেক এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু এমন জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তা সমগ্র সমাজকে আহত করে এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
পর্যবেক্ষণে আদালত আরও বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ‘বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’। মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সমক্ষে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবী থানায় মামলার এজাহারকারী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং পারভিন আক্তারের শিশুকন্যা রামিসা আক্তার (৮) ভয়াবহ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। তারা পল্লবী থানাধীন ১১ নং সেকশনে ভাড়া থাকতেন। ঘটনার দিন ও সময়ে পারভিন আক্তার তার শিশুকন্যা রামিসাকে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে তার এক পায়ের জুতা দেখতে পান। পরবর্তীতে রামিসার মায়ের চিৎকারে আশপাশের সবাই এলে এজাহারকারী আব্দুল হান্নান মোল্লা দরজা ভেঙে প্রবেশ করলে দেখতে পান, শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর দেহ খণ্ডিত অবস্থায় খাটের নিচে রাখা হয়েছে এবং আসামি মো. সোহেল রানা ভুক্তভোগীর হাত কেটে আলাদা করেন এবং যৌনাঙ্গ চাকু দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেন। পরে মৃতদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখেন এবং মাথা বালতিতে লুকিয়ে রাখেন।
আসামি স্বপ্না খাতুনের পরামর্শে জানালার গ্রিল কেটে তার স্বামী সোহেল রানা পালিয়ে যান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না খাতুনকে আটক করে এবং মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ২০ মে আব্দুল হান্নান মোল্লা মামলা করেন এবং এসআই অহিদুজ্জামান তদন্তভার প্রাপ্ত হন। আসামি সোহেল রানা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের কাছে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে সব সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হওয়ায় অভিযুক্ত মো. সোহেল রানা ও মোছা. স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানার অভিযোগপত্র ২৩ মে আদালতে দাখিল করেন।
শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা মহানগর মামলার নথি প্রাপ্তির পর আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিচার্থে আমলে গ্রহণ করেন এবং আসামি পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় আদালতের নির্দেশে মুসা কলিমুল্যাহকে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অত্র ট্রাইব্যুনাল অবকাশ বহির্ভূত রেখে কার্যক্রম চলমান রাখার আদেশ দেন।
গত ১ জুন অভিযুক্ত সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং ধষর্ণ পরবর্তী অন্যান্য কার্যকলাপের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অপর আসামি মোসা. স্বপ্না খাতুন ওই অপরাধ সংগঠনে সহায়তা করা, আলামত বিনষ্ট করায় বাধা না দেয়া এবং স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করায় তার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
বিচার পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সাপেক্ষে ২ জুন সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত করা হয়। ৩ জুন অভিযুক্ত মো. সোহেল রানা ও মোসা. স্বপ্না খাতুনকে ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হলে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক শেষে আজ ৭ জুন রায় প্রচারের জন্য ধার্য হয়।
আদালতে রামিসার বাবা, মা, বড় বোন রাইসা আক্তারসহ সব সাক্ষী ঘটনার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেন। ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী লিপিবদ্ধকারী ম্যাজিস্ট্রেটও আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, তারা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ দাবি করে আসামিরা সম্পূর্ণ নির্দোষ।
আদালত সাক্ষীদের বক্তব্য, জব্দতালিকা, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেন। প্রসিকিউশন পক্ষ ঘটনার তারিখ, সময় ও ঘটনাস্থল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত স্বপ্না খাতুন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি সোহেল রানাকে লাশ গুম করতে ও পালিয়ে যেতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন।
আদালত রায় প্রদানকালে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারার বিধান পর্যালোচনা করেন। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিশ্লেষণে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের জড়িত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রমাণ হয়। আদালত ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে শাস্তি প্রদানের উচ্চ আদালতের নজিরও উল্লেখ করেন।
সার্বিক বিবেচনায় আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০- এর ধারা ৯(২) মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং তাকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। একইভাবে অভিযুক্ত মোছা. স্বপ্না খাতুনকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং তাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়। আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাদের ওপর আরোপিত অর্থদণ্ডের টাকা ভুক্তভোগী মৃত রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীকে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন আদালত।
বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছে।
রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এর তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালন করায় আদালত সন্তোষ প্রকাশ করেন।
আদালত প্রত্যাশা করে, এই মামলার ন্যায় দ্রুত ও মানসম্মত বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হবে।
একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, বরং বিচার ব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়।
আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন ও প্রমাণের আলোকে সত্য উদঘাটন করা। এই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন।












