ঠাকুরগাঁওয়ে এক স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রায় ১৫ বছর পর মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। মামলায় তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে দণ্ডিতদের সম্পত্তি বিক্রিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে ঠাকুরগাঁও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মনসুর এ রায় ঘোষণা করেন।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে আনিস রানা, মুসলিমনগর এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম এবং ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল। আদালত তাদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দিয়েছেন।
এ ছাড়া পৌর শহরের মুসলিমনগর এলাকার মো. সেলিমের ছেলে আনিছুর, বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর খতু এবং বজলুর ছেলে মো. লালুকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী দক্ষিণ সালন্দর এলাকায় এক বান্ধবীর বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়কের পাশে এনামুল পেট্রোলপাম্পের পেছনের নির্জন এলাকায় কয়েকজন যুবকের কবলে পড়েন। তাকে জোর করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনজন পর্যায়ক্রমে তাকে ধর্ষণ করেন এবং অপর তিনজন এ ঘটনায় সহযোগিতা করেন।
ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। পরে ভুক্তভোগী বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানান। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর ভুক্তভোগীর বাবা মো. মোসলেম উদ্দিন ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল। আসামিপক্ষে ছিলেন, অ্যাডভোকেট মো. মেহেদী হাসান ও অ্যাডভোকেট মো. দিদার আলী।
রায়ে আদালত বলেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারার সুবিধা পাবেন না। তারা জেল কোড অনুযায়ী কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশনের সুবিধাও ভোগ করতে পারবেন না।
এ ছাড়া আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। আপিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দণ্ডিতদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে ওই অর্থ আদায় করা হবে। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসক তাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেবেন। পরে সেই অর্থ ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির ক্ষেত্রে বিচারপূর্ব হাজতবাসের সময় দণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে এবং তারা আইন অনুযায়ী রেমিশনের সুবিধা পাবেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মেহেদী হাসান বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর আমরা তা পর্যালোচনা করব। এরপর আইনি দিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আর রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনা করে আদালত ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন। আজকের রায়ে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এই রায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।












