জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় আনন্দ মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে বাবার হাত ধরেই দৌড়াচ্ছিল ছয় বছরের শিশু জাবির ইবরাহিম। হঠাৎ ছুটে আসা গুলিতে থেমে যায় তার ছোট্ট জীবন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সন্তানের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে জড়িতদের সর্বোচ্চ বিচার দাবি করেছেন বাবা কবির হোসেন।
সোমবার (১৮ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে কবিরের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে ছয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাবিরের বাবা।
ট্রাইব্যুনালে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আনন্দ মিছিল হয়। উত্তরায় স্কলাস্টিকা স্কুলের বিপরীত পাশে হওয়া এ মিছিলে নিজের দুই ছেলে, এক ভাতিজা ও স্ত্রীকে নিয়ে অংশ নেন কবির। সেখানে নির্মাণাধীন একটি ফুটওভার ব্রিজে দুই ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়ে ওঠেন তিনি। নিচে ছিলেন তার স্ত্রী। তারা ছবি তোলাসহ ভিডিও করছিলেন।
কবির বলেন, বিকেল সাড়ে চারটার সময় হঠাৎ উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে মাথায় হেলমেট ও গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা ১৫-২০ জনের একটি দল গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে করতে আমাদের দিকে আসতে থাকেন। তখন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছিলেন মানুষ। আমিও দ্রুত দুই ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়ে নিচে নেমে পড়ি। জাবিরের হাত ধরে পূর্বদিকে আমার বাসার দিকে দৌড়াচ্ছিলাম। এপিবিএন হেডকোয়ার্টারের গেটের কাছে আসামাত্রই ‘আহ’ করে চিৎকার দেয় জাবির। এ সময় দেখি তার পেটের নিচে বাম পায়ের উরুতে গুলি লেগেছে। তার পা বেয়ে রক্ত ঝরতে থাকায় হাঁটতে পারছিল না।
তিনি আরও বলেন, ছেলের এ অবস্থা দেখে কোলে নিয়ে একটি মোটরসাইকেলে উঠি। তখন এপিবিএন হেডকোয়ার্টারের গেটের উল্টো পাশে আরও কয়েকজনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি। প্রথমে জাবিরকে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেই। তবে শিশু আইসিইউর ব্যবস্থা না থাকায় সাড়ে ৫টার দিকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানেও আইসিইউ খালি ছিল না। পরে উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টরে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিলে আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এরপর লাশ নিয়ে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ সময় ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে জয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জুনাইদ আহমেদ পলকসহ মন্ত্রিপরিষদের সবাইকে দায়ী করেন কবির হোসেন। তাদের নির্দেশেই গুলি করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া শেখ হাসিনার একটি অডিও রেকর্ডে লেথাল ওয়েপন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন জানতে পারেন এই সাক্ষী।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে এপিবিএন, পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। তাদের মধ্যে দায়ীরাসহ সবার সর্বোচ্চ বিচার চাই।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কবিরকে জেরা করেন পলকের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো ও জয়ের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ। তাকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সুলতান মাহমুদ, মঈনুল করিম ও মার্জিনা রায়হান।
এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।














