কুমিল্লাসোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৯ সন্তান থাকতেও গাছের নিচে বৃদ্ধ মা-বাবা, যা জানা গেল

প্রতিবেদক
Cumilla Press
জুন ৮, ২০২৬ ৮:২৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বরগুনার তালতলী উপজেলায় বৃদ্ধ বাবা ও অসুস্থ মায়ের সেবা-শুশ্রূষা না করে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সন্তানদের বিরুদ্ধে। ওই বৃদ্ধ দম্পতির ১০ সন্তান থাকার পরেও এখন তাদের আশ্রয় হয়েছে বাড়ির সামনে থাকা গাছের নিচে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। আর ওই ভিডিওতে বৃদ্ধ বাবা আমজেদ হাওলাদার দাবি করেন, অসুস্থ স্ত্রীর সেবা-শুশ্রূষা করতে অপারগতার কারণেই সন্তান ও তাদের স্ত্রীরা ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন তাদেরকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আক্ষেপ নিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে সন্তানদের প্রতি হতাশা প্রকাশ করছেন বাবা আমজেদ হাওলাদার। আর পাশেই গাছের নিচে প্লাস্টিকের একটি পাটির ওপর নির্বাক হয়ে বসে আছেন অসুস্থ মা রওশনারা। অসুস্থতার কারণে কখনো আবার শুয়ে পড়ছেন বৃদ্ধ মা, আর পাশে বসে থাকছেন বাবা। স্ত্রীকে নিয়ে এতদিন ছোট ছেলের বাড়িতে থাকলেও এখন অসুস্থ স্ত্রীর সেবা-শুশ্রূষা করতে অপারগতার কারণে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন ওই ছেলের স্ত্রী রোকেয়া, এমন দাবি বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদারের।

অপরদিকে ছোট ছেলের স্ত্রী রোকেয়া ওই ভিডিওতে দাবি করেন, অসুস্থ শাশুড়ি ঘরে মলমূত্রত্যাগ করায় তাকে পরিষ্কার করে ঘরের বাইরে রাখা হয়েছে। এছাড়াও দশ সন্তানের প্রত্যেকের বাড়িতে তারা এক মাস করে থাকবেন বলেও বলতে শোনা যায় তাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের বড় ভাইজোড়া গ্রামের বাসিন্দা আমজেদ হাওলাদার। তার তিন ছেলে ও সাত মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের মৃত্যু হওয়ায় এখন মোট নয় সন্তান রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে হওয়ায় যে যার শ্বশুরবাড়িতে এবং তিন ছেলে আলাদা আলাদা ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন। আর বয়সের ভারে আমজেদ হাওলাদার অক্ষম হয়ে পড়ায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন ছোট ছেলে ছগীর হাওলাদারের বাড়িতে। চিকিৎসার অভাবে দিনদিন বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন স্ত্রী রওশনারা। এমনকি বিছানায় মলমূত্রত্যাগ করেন তিনি। এ অবস্থায় গত শনিবার (৬ জুন) অসুস্থ ওই শাশুড়ির সেবা-শুশ্রূষা করতে অপারগতার কারণে বাড়ি থেকে বের করে ঘরের সামনে গাছের নিচে রাখেন ছোট ছেলের স্ত্রী রোকেয়া। এমনই অভিযোগ করেন বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদার।

পরবর্তীতে এ ঘটনার পর ওইদিনই স্থানীয়দের পরামর্শে নিরূপায় হয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদার। পরে তার অভিযোগের বিষয়ে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ওই এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আ. সালামকে। এরপর আমজেদ হাওলাদারে ছেলে ও তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলে অসুস্থ রওশনারা ও আমজেদকে আবারও ছোট ছেলের ঘরে উঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে, ছেলে এবং তাদের স্ত্রীদের ক্ষিপ্ত আচরণে ভয়ে ওই ঘরে এখনো থাকছেন না বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদার।

অসুস্থ মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদারের বড় ছেলে কাদের হাওলাদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি গত দশ বছর আগে থেকেই বাবাকে আমার ঘরে থাকতে বলেছি। কিন্তু সে তাতে রাজি হয়নি এবং সে তার নিজের ঘরেই থাকবে জানায়। কিন্তু মা আমার বাসায় থাকতো। বাবা মাঝে মধ্যে আমার ঘরে আসতো। বর্তমানে আমি আমার ঘর তৈরির কাজ করায় মালামালসহ মাকে নিয়ে ছোট ভাইয়ের ঘরে দিয়েছি। পরে আলাদা ছোট একটি রান্না ঘরের মতো তৈরি করে আমরা সেখানে গেলেও মা ছোট ভাইয়ের বাড়িতেই ছিল। তবে আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর মুখের ভাষ খারাপ হলেও আমার স্ত্রী গিয়ে মায়ের মলমূত্র পরিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় সেবা-শুশ্রূষা করতো।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন রাতে বাবার সঙ্গে ছোট ভাইয়ে স্ত্রীর কথা-কাটাকাটি হয়েছে শুনেছি। পরে আলাদা থাকার জন্য বাবা একটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার কথা বলেন আমাকে। এ ছাড়া ছোট ভাইয়ের স্ত্রীও আমাকে তাদের জন্য একটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার কথা বলেন। তাদের জন্য ঘর তৈরি করা সিদ্ধান্তও হয়, কিন্তু আমার বাবা কাউকে কিছু না বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গেছেন। মা অসুস্থ থাকায় প্রতিদিনই সে ঘরের মধ্যে তিন চারবার মলমূত্রত্যাগ করেন। তাকে পরিষ্কার করে বাইরে বসানো হয়। একইভাবে ওইদিন মাকে পরিষ্কার করে বাইরে বসানো হলে বাবা কান্নাকাটি করে মানুষকে বলেন, তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে বের করে দেওয়া হয়নি।

অপরদিকে বড় ছেলে কাদের হাওলাদারের এমন দাবিকে অস্বীকার করে আমজেদ হাওলাদারের মেঝ ছেলে মো. খলিল হাওলাদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাবার কথা অনুযায়ী আমার বড় বোনের মৃত্যুর পর বোনের সন্তানকে আমি আমার ঘরের জমি দিয়ে দিয়েছি। আর এ কারণে আমার বড় ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের কারো সাথে কথা বলেন না। বাবা-মা খেয়ে আছে, নাকি না খেয়ে আছে সে খবরও রাখে না। তার যে অর্থসম্পদ আছে তাতে সকলকেই খাইয়ে পড়িয়ে তিনি ভালো রাখতে পারেন। কিন্তু ছোট ভাইয়ের স্ত্রী তার ছেলে এবং তার ভাই মিলে মাকে ঘর থেকে বের করে গাছের নিচে শুইয়ে রাখেন।

এ অবস্থা দেখে বাবা কান্নাকাটি করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানান। পরে সাংবাদিকসহ স্থানীয়রা এলে ছোট ভাইয়ের স্ত্রী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শাশুড়িকে গোসল করিয়ে বাইরে রাখা হয়েছে। আসলে ঘরে মলমূত্রত্যাগ করার কারণেই ঘর থেকে মাকে বের করে দিয়েছে। এ বিষয়ে আমার বড় ভাইয়ের যে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন ছিল তিনি তা রাখেনি।

বাবা-মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সবশেষ অবস্থা এবং কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে জানতে ওই এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আ. সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি চেষ্টা করেছি বিষয়টি সমাধানের জন্য। কিন্তু ওই বৃদ্ধের ছেলে এবং তাদের স্ত্রীরা খুবই ক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। এমনকি বড় ছেলের মাধ্যমে হেনস্তারও শিকার হয়েছি। তবে তাদেরকে ঘরে থাকার ব্যবস্থা করতে পারলেও স্ত্রীকে রেখে ভয়ে রাতে অন্যের বাড়িতে গিয়ে থেকেছেন বৃদ্ধ আমজেদ হাওলাদার।

স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাবা-মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছোট ছেলে ছগীর হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘর থেকে বের করে দেওয়ার মৌখিক অভিযোগ পেয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্যের মাধ্যমে তাদেরকে ঘরে উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি। আমাদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া, তা আমরা করেছি। এখন যদি তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ থাকে এবং লিখিত অভিযোগ পাই তাহলে তা নিরসনের জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।