নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যা মামলায় জড়িত সন্দেহে অপূর্ব (২৪) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে দুর্গাপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপূর্ব ওই উপজেলার বাসিন্দা।
নেত্রকোনা জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম রোববার সকালে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যার ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার বিরিশিরি এলাকার তেলুঞ্জিয়ায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আটজনকে আসামি করে মামলা করেন।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতেন।
আলিফের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের চারুলিয়া মাইজপাড়া গ্রামে। তিনি দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। তার চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
ঘটনার দিন রাতে বাড়ির সামনের একটি দোকানে বসেছিলেন আলিফ। এ সময় সেখানে অবস্থান নেওয়া দুই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক তাকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। পরে স্থানীয়রা তাকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ তার মরদেহ নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। শুক্রবার ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি চারুলিয়া মাইজপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন আলিফ। গত বছরের নভেম্বরে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলামের যোগদান উপলক্ষে পুলিশ সুপারের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন। সভায় তিনি জানান, বাইরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা অবস্থান করছে এবং বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে গুলি করার আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সভার একটি ভিডিওতে আলিফকে বলতে শোনা যায়, তার কাছে বার্তা আসছে যে দুজন অস্ত্রধারী রাস্তায় অপেক্ষা করছেন। তাঁদের একজনের কাছে পাঁচটি গুলিসহ একটি নাইন এমএম পিস্তল রয়েছে।
সভায় আলিফ আরও বলেন, তিনি সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন করেন। নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি সশস্ত্র চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এসব চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি পুলিশ সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পুলিশকে উদ্দেশ করে আলিফ বলেছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা না হলে তাকে হয় দেশ ছেড়ে যেতে হবে, নয়তো অপরাধীদের মোকাবিলায় অন্য পথ বেছে নিতে হবে। নিজের শ্বশুরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
নেত্রকোনা জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অপূর্ব পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে দুপুরে আদালতে পাঠানো হবে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত এবং আলিফের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, আমি যোগদানের পর সাংবাদিক আলিফ প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে আলিফের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।












