ঘরের দরজায় পা রাখতেই থমকে যেতে হয়—যেদিকে চোখ যায়, ঘরের দেয়ালে দেয়ালে এক ফুটফুটে হাসিমুখের ছবি। ছোট্ট অনুশ্রীর। তার মা-বাবার পুরো পৃথিবী, প্রাণের চেয়েও যে প্রিয়। যে ঘরে কান পাতলে শোনা যেত খিলখিল হাসি, ছড়িয়ে ছিল রঙিন আনন্দ, সেখানে আজ ভর করেছে নিস্তব্ধ শোক। বাবা-মার বুক খালি করে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে তাকে।
গত শনিবার নগরীর পাহাড়তলী এলাকার ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে অনুশ্রী দাশ (৭)। দন্ত চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কর্মরত সুবল দাশের এক ছেলে ও এক মেয়ে। অনুশ্রী ছিল ছোট। সে চট্টগ্রামের রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।
অনুশ্রীর বাবা সুবল দাশ জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর তার মেয়ের জ্বর আসে। শুরুতে স্থানীয় চিকিৎসককে দেখালেও পরে শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ মতে ঘরে থেকে শিশুটির চিকিৎসাসেবা চলছিল।
পরে অনুশ্রীর রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমতে থাকে। গত শুক্রবার সকালে তাকে খুলশীর চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় তারা আইসিইউর খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে ওই দিন সন্ধ্যায় নগরীর পাহাড়তলী এলাকার অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বিভাগে ভর্তি করা হয় অনুশ্রীকে। সেখানেই শনিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অনুশ্রীর বাবা সুবল দাশ বলেন, যেদিন আমার মেয়েকে ইম্পেরিয়ালে ভর্তি করানো হয়, ওই দিন সে আমাকে কান্না করে বলছিল, বাবা আমি থাকব না। এমনকি শনিবার যেদিন মারা যায় ওই দিন দুপুরেও আমি দেখা করতে গেলে সে বাসায় চলে যাওয়ার বায়না করতে থাকে। বিকেলে চিকিৎসকরা আমাকে জানান, আমার মেয়ের অবস্থা ভালো না, লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হবে। বলতে বলতেই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করে।
গত ২ আগস্ট বড় করে মেয়ের জন্মদিন পালন করেছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সবাইকে নিয়ে আমার মেয়ের জন্মদিন আমি ধুমধাম করে পালন করেছি। সামর্থ্য না থাকার পরেও তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার সব ইচ্ছা আমি পূরণ করেছি। আমার মেয়ে বাবা ছাড়া কিছু চিনেই না, এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব?
মেয়ের সুস্থতা কামনা করে ফেসবুকে তার বাবা সুবল লেখেন, ‘যাদের বাসায় পূজার আসন আছে, আর যারা আমার মুসলিম ভাইবোন আছেন, সবার কাছে হাতজোড় করে বলছি, আমার অনুশ্রীর জন্য আশীর্বাদ করবেন। মুসলিম ভাইয়েরা মসজিদে গিয়ে দোয়া করবেন।’
জ্বরে কাবু হয়ে অনুশ্রী তখন ঠিকমতো খেতেও পারছিল না। বাবার হাতে খেতে ভালোবাসত মেয়েটি। সেই স্মৃতিও লিখেছিলেন সুবল। ফেসবুকে লেখেন—‘আমার আদরের মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বাবার হাতে খেতে মেয়ে কত পছন্দ করত। আজকে দুদিন ওর মুখে কিছুই তুলে দিতে পারছি না। খাবারের প্রতি ওর এত অনীহা।’
শনিবার সকালে অনুশ্রী মারা যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র কয়েকটি শব্দ লিখেছেন সুবল চন্দ্র দাশ—‘আমার মেয়ে অনুশ্রী আর নেই।’ শেষ বিদায়ের ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘আমার মামণি অনুশ্রীকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম। বাবার কত আদরের মেয়ে ছিল। ঈশ্বরের চরণে শেষ বিদায় দিয়ে আসলাম।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, শিশুটির ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি, তার অবস্থা ডিআইসি (শরীরের স্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা ভেঙে পড়া) পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তার জানান, অনুশ্রী খুব লক্ষ্মী মেয়ে, তার বাবা নিয়মিত তাকে স্কুল থেকে আনতে যেত, খুবই বাবাপ্রিয় মেয়ে ছিল সে।
রিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাবা-মায়ের সংসারটা ভেঙে গিয়েছিল ছয় বছর আগেই। আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন দুজন। সেই থেকে অবুঝ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তাদের নিজেদের জীবনটাকে নতুন করে বাঁধার কথা ভাবেননি দুজনের কেউই। দীর্ঘদিন বাবা-মার সম্পর্ক না থাকলেও নিজেদের দুই ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা সম্প্রতি একই এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ বছরের শিশু সিরাজুম মনিরা নামে আরেক শিশু মারা যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সিরাজুম মনিরা সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার নুরুন্নবীর মেয়ে।












