কুমিল্লামঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে ছুটছেন ত্রাণের দিকে

প্রতিবেদক
Cumilla Press
আগস্ট ২৭, ২০২৪ ৪:৩২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে ছুটছেন ত্রাণের দিকে

স্টাফ রিপোর্টার:

বন্যার ভয়াল থাবায় কুমিল্লার ১৪টি উপজেলার লাখ লাখ মানুষ বিপর্যস্ত। বানের জলে ডুবে গেছে সেখানকার সব কিছু, তাই সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণই তাদের একমাত্র ভরসা। পানি জমে যাওয়ায় এলাকার সড়কগুলোতে হাঁটুপানি, ফলে নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোটই হয়ে উঠেছে ত্রাণ পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম। যে কেউ ত্রাণ দিতে গেলে, নারী-পুরুষ সবাই বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে সেদিকে ছুটে যায়।

সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে গোমতীর বাঁধ ভাঙনের শিকার বুড়িচং উপজেলার খাঁড়াতাইয়া গ্রামে গেলে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু একটি দ্বিতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।

ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারের শব্দ শুনেই তারা একটু খাবার ও পানির আশায় ছুটে আসেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িই পানিতে ডুবে গেছে। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউবা গোমতীর বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে কিছু পুরুষ বাড়িতেই থেকে গেছেন মালপত্র রক্ষার জন্য।

খাঁড়াতাইয়া গ্রামের চারপাশ থই থই পানিতে ভরা, কোথাও সামান্য মাটির চিহ্নও নেই। এই বিপদসংকুল অবস্থার মাঝেও কেউ কেউ বাড়িতে থেকেই জলমগ্ন জীবন যাপন করছেন। রফিকুল ইসলাম নামে একজন স্থানীয় বাসিন্দা নৌকার শব্দ শুনেই ছুটে আসেন।

তিনি জানান, ঘরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, সব পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি ত্রাণের নৌকা থেকে খাবারের সঙ্গে মশার কয়েল, দুই বোতল দুধ এবং পানি চেয়ে নেন।

রফিকুল আরও জানান, যা শুকনো খাবার পাচ্ছেন, তা দিয়ে কোনোমতে চলছেন, কিন্তু খাবার পানির সংকট প্রকট। কয়েক দিন ধরে রান্না করা খাবার পাননি।

ওই গ্রামের একটি দ্বিতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন অর্ধশতাধিক বানভাসি। আফজাল হোসেন নামে একজন জানান, তিনি তার তিন সন্তানসহ সেখানে আছেন এবং তাদের আরও ত্রাণ ও পানি প্রয়োজন। ভবনে আশ্রয় নেওয়া লোকদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা নেই।

এ সময় ষোলনল ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন একটি ট্রলার নিয়ে ত্রাণ বিতরণ করতে আসেন। তিনি কলাগাছের ভেলায় করে দুর্গত লোকজনের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন।

ত্রাণের ট্রলারের শব্দ শুনেই বুক সমান পানি ডিঙিয়ে ছুটে আসেন পাশের বেড়াজাল গ্রামের মামুনুর রশীদ ও তার এক প্রতিবেশী নারী।

তারা জানান, সোমবার তারা কোনো ত্রাণ পাননি। দুটি প্যাকেট ত্রাণ নিয়ে তারা ঘরে ফিরে যান।

পাশের নানুয়া বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে ফার্নিচার ব্যবসায়ী ময়নাল হোসেন বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রের টিউবওয়েল নষ্ট, ত্রাণ হিসেবে যে শুকনো খাবার ও পানি পাই তা দিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়। বাড়িতে ধান-চাল সব ফেলে এসেছি, বাড়ি ফিরে খাবার কি? এই চিন্তায় ঘুম আসেনা।’

এ আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন পাশের বাড়ির বাসিন্দা মমতাজ বেগম। তিনি বলেন, গোমতীর পানি আমাদের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। একই বাড়ির তিন পরিবারের ১৩ জন এই আশ্রয়কেন্দ্রে আছি।

অফুলা বেগম বলেন, ‘আমরা বেঁচে থেকেও যেন মরে গেছি। এখন যে সামান্য শুকনো খাবার পাই, তা দিয়ে কোনোরকম দিন কাটাচ্ছি। চার দিন গোসল করিনি। এটা কি জীবন?’ বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে খাবারের জন্য ছুটে যায়।

বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার অন্যান্য দুর্গত এলাকারও একই চিত্র। আশ্রয়কেন্দ্র ও বাড়িতে আটকা পড়া লোকজনের একই আকুতি, ‘আরও ত্রাণ চাই, আরও পানি চাই। শিশুদের খাবার চাই।’ যদিও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের দাবি করা হচ্ছে।

বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাহিদা আক্তার জানান, গোমতীর ভাঙনের ফলে এ উপজেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিদিন পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে।

 

 

 

 

বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে ছুটছেন ত্রাণের দিকে।

বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে ছুটছেন ত্রাণের দিকে।

বাঁচার তাগিদে পানি ডিঙিয়ে ছুটছেন ত্রাণের দিকে।