টাঙ্গাইলের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ শ্রমিকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নোয়াখালী থেকে রড বোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফেরার পথে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর কাছে ট্রাক উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়। মূলত কম খরচে বাড়ি ফেরার তাড়না আর পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার স্বপ্নই কাল হয়েছে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত এই শ্রমিকরা নোয়াখালীতে ফেরি করে প্রসাধনী পণ্য বিক্রি করতেন। ঈদ উদযাপনের জন্য যাতায়াত খরচ বাঁচাতে তারা যাত্রীবাহী বাসের পরিবর্তে বেছে নিয়েছিলেন একটি রড বোঝাই ট্রাক। কম খরচে বাড়ি পৌঁছানোর আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা ট্রাকের ওপরে চড়ে বসেন। কিন্তু যমুনা সেতুর কাছে পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে রড বোঝাই ঘাতক ট্রাকটি উল্টে যায়। ভারী রডের নিচে চাপা পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই নিভে যায় ১৫ তাজা প্রাণ।
একসাথে এতগুলো মানুষের মৃত্যুর খবর নওগাঁর মান্দায় পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় নেমে এসেছে অন্ধকার। কোনো কোনো বাড়ি এখন শোকে পাথর, আবার কোথাও আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ সন্তান, আবার কেউবা বাবা বা ভাইকে।
দুর্ঘটনায় নিহত এক শ্রমিকের বৃদ্ধ মা খাটিয়ার ওপর বসে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘বাবা গতকাল ফোনে বলেছিল, মা আমি আগামীকাল আসতেছি। তোমার জন্য কি আনব? এখন আমার বাবাই নাই হয়ে গেলো। ও আল্লাহ, আমার বুকটা কেন এমন খালি করে দিলে?’
নিহত আরেক শ্রমিকের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সংসারের খরচ বাঁচানোর জন্য কত কষ্টই না করত মানুষটা। বাসের ভাড়া বেশি বলে ট্রাকে উঠেছিল। এই একটুখানি টাকা বাঁচানোর চেষ্টাই আজ আমার পুরো সংসারটা ভেঙে দিল।’
জুলফিকার আলী নামে মান্দার স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘এই লোকগুলো দিনরাত রোদ-বৃষ্টি এক করে নোয়াখালীর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কসমেটিকস বিক্রি করত। শুধু বাসের বাড়তি ভাড়া বাঁচিয়ে সেই টাকাটা ঈদের বাজারে খরচ করবে বলে ট্রাকে উঠেছিল। এই সামান্য ভাড়ার টাকা বাঁচাতে গিয়ে যে এভাবে পুরো পরিবারগুলো শেষ হয়ে যাবে, তা ভাবলেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে।’
স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের এই মান্দা এলাকা থেকে শত শত গরিব মানুষ পেটের দায়ে ঢাকা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করে। ঈদের সময় যখন বাসের ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়, তখন এই সাধারণ মানুষগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। তারা বাধ্য হয়েই কম খরচে ট্রাকে বা পিকআপে বাড়ি ফেরার ঝুঁকি নেয়।’












