কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী ধারাবাহিক পুলিশি অভিযানে অপরাধপ্রবণতা কমে রাতের নগরজীবনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এক মাসব্যাপী বিশেষ অভিযানে জেলার ১৮টি থানা এলাকায় মোট ৩ হাজার ৪১২ জনকে আটক করে পুলিশ। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে সরাসরি জড়িত না থাকায় ২ হাজার ৩৮৬ জনকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১ হাজার ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের এই সমন্বিত অভিযানের প্রভাবে কুমিল্লা নগরের টাউন হল প্রাঙ্গণ, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ও রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় কিশোর ও যুবকদের বেপরোয়া আড্ডা এবং বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড কমেছে। উচ্চশব্দে মোটরসাইকেল চালানো ও প্রকাশ্যে মাদক সেবনের মতো কর্মকাণ্ড কমে আসায় গভীর রাতেও সাধারণ পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষের চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে নৈশকালীন ছিনতাই ও অপরাধপ্রবণতা কমে আসার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে নগরজীবনে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে লালমাই পাহাড়ি এলাকা থেকে এক স্কুলশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। মাসজুড়ে চলা এই অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে সরাসরি জড়িত না থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অধিকাংশকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কুখ্যাত কিশোর গ্যাং ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনসহ বেশ কয়েকজন দলনেতা রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ধারাবাহিক এই অভিযানের ফলে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দৃশ্যত কমে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ কার্যক্রমকে পুলিশের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পৃষ্ঠপোষকের মদদ পাওয়া গেলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে নগরীতে ফিরে আসা এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব অপরাধীকে যারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, কেবল অভিযান পরিচালনা করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিয়মিত নজরদারি, অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিরাপদ নগরজীবন বজায় রাখা সহজ হবে।












