কুমিল্লাবুধবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খামেনির জানাজায় যাওয়া বিমানে বাধা, যে ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে সৌদি আরবকে

প্রতিবেদক
Cumilla Press
অক্টোবর ১৩, ২০২৬ ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সৌদি আরবকে বিশ্বমঞ্চে একটি আধুনিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কিন্তু ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সেই পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব আবারও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন ভুল হিসাবের মাশুল দিতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিকে?

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু ভুল হিসাব। প্রথমত, গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব ভেঙে যায়। ইয়েমেনে আমিরাতি বাহিনী হুট করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ায় সেখানে বিরাট ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, যা সৌদিরা পূরণ করতে পারেনি। 

দ্বিতীয়ত, গত জুলাইয়ে তেহরানে সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় হুতি প্রতিনিধিদলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ইরানি বিমান সেখানে গেলে সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি আরব। ফলস্বরূপ হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিল করে। লোহিত সাগর ও সৌদির তেল অবকাঠামোতে হামলা শুরু করে তারা। কিন্তু হুতিদের এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য সৌদি সামরিক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় মিত্ররা মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

তবে, তৃতীয় বড় ভুল হিসাবটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকার পরও, সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করায় সৌদি আরব নিজেকে আরও একা ও অরক্ষিত বোধ করতে শুরু করে।

মূলত সৌদি ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয় গত জুলাইয়ে। লোহিত সাগরে সৌদি আরবকে বাধার মুখে ফেলতে বাব আল-মানদেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেয় হুতিরা। সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের নতুন নতুন অঞ্চলও দখল করে গোষ্ঠীটি। পরে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কিছু এলাকা আবার হুতিদের কাছ থেকে মুক্ত করেছে। যদিও পরে আবার দুই পক্ষের তীব্র লড়াই হয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে গত পাঁচ দিনে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে চার দফা হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে গত শনিবার। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের এই হামলায় বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। সব হামলা মিলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭। 

হুতিরা সৌদি আরবের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন ইয়েমেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানা সেন্টারের গবেষক ইয়াসমিন আল এরিয়ানি। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, সৌদিতে হামলা বাড়িয়েছে তারা। হুতিদের এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোকে উসকানি দিচ্ছে। সংঘাতের পরিধি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও এসব হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী।

অপরদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন সৌদি আরব মিসর, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

পরিশেষে একটি কথা বলাই যায়, বাইরের দেশের সমর্থন বা কিছু সামরিক সাফল্য পেলেও ইয়েমেনের এই সংঘাতে সৌদির দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি পাওয়া বেশ অনিশ্চিত। এর বড় কারণ বিভক্ত মিত্রবাহিনী এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে। এখন ইরান-সমর্থিত হুতিদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রিয়াদকে কোন পথে হাঁটতে হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

প্রসঙ্গত, ইরানপন্থী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। পরের বছরে দেশটিতে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। লড়াই দুই পক্ষের মধ্যে হলেও মূল ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ লোকজন। 

২০২২ সালে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্য দিয়ে থামে ওই সংঘাত। যদিও এরই মধ্যে ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ। বর্তমানে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকার দুই পক্ষই ইয়েমেনে নিজেদের দখলে থাকা অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।