কুমিল্লাশনিবার, ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নাম বদলেও হলো না শেষরক্ষা, হত্যার ৩১ বছর পর গ্রেফতার আসামি

প্রতিবেদক
Cumilla Press
এপ্রিল ২৫, ২০২৬ ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এক কিশোর ছেলেকে হত্যার পর পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে গা ঢাকা দেন। বদলে ফেলেন নিজের নাম। শুধু তাই নয়, এরপর সমাজকর্মী ও জনপ্রিয় ইউটিউবার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এরপরও শেষরক্ষা হয়নি। অবশেষে প্রায় ৩১ বছর পর সেই পুলিশের হাতেই গ্রেফতার হয়েছেন আসামি।

এনডিটিভির এক প্রতিবেদন মতে, জনপ্রিয় ইউটিউবার সেলিম ওয়াস্তিক, যিনি নিজেকে প্রকাশ্যে ‘এক্স-মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দিতেন, প্রায় ৩১ বছর আগে দিল্লির এক ব্যবসায়ীর ১৩ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, ভুয়া পরিচয়ে বসবাস করা সেলিম ওয়াস্তিককে এক গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গাজিয়াবাদের লোনি এলাকায় শনাক্ত করা হয়। পুরনো নথি, আঙুলের ছাপ এবং ছবির মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হত্যার অভিযোগে তাকে তিহার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ১৯৯৫ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন দিল্লির এক সিমেন্ট ব্যবসায়ীর ছেলে সন্দীপ বানসাল দিল্লিতে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু আর ফিরে আসেনি। পরিবার অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পায়নি।

পরদিন ওই ব্যবসায়ীর কাছে একটি ফোন আসে, যেখানে জানানো হয়, তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে এবং তাকে নিরাপদে ফেরত পেতে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। অপহরণকারীরা বলে দেয়, লোনি ফ্লাইওভারের কাছে একটি বাসে টাকা রেখে আসতে হবে এবং সতর্ক করে দেয়—যদি পুলিশকে জানানো হয়, তাহলে ছেলেটিকে হত্যা করা হবে।

কিন্তু এই হুমকিতে ভয় না পেয়ে ওই ব্যবসায়ী বাবা ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানান এবং গোকুলপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তের সময় ব্যবসায়ীর এক প্রতিবেশী জানান, তিনি শিশুটিকে ‘মাস্টারজি’ নামে পরিচিত এক লম্বা লোকের সঙ্গে একটি অটোরিকশায় করে যেতে দেখেছিলেন।

এই সূত্র ধরে পুলিশ সেলিম খান নামে এক ব্যক্তিকে (বর্তমানে সেলিম ওয়াস্তিক) গ্রেফতার করে—যিনি তখন দারিয়াগঞ্জের রামযস স্কুলে মার্শাল আর্টস প্রশিক্ষক ছিলেন। সেলিম খান নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং পুলিশকে মুস্তাফাবাদের একটি নালার কাছে নিয়ে যান, যেখানে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পাশাপাশি সেলিম খান এই হত্যাকাণ্ডে তার এক সহযোগী অনিলের নামও বলে দেন, যিনি অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা এবং মুক্তিপণের ফোন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে অনিলকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সঙ্গে পুলিশ শিশুটির স্কুল ব্যাগ, টিফিন বক্স ও ঘড়ি উদ্ধার করে, যা আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

দুই বছরেরও বেশি সময় এই হত্যা মামলার রায় হয়। ১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট আদালত সেলিম খান (ওরফে সেলিম ওয়াস্তিক) এবং অনিলকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তারা দুজনেই পরে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করেন।

২০০০ সালের ২৪ নভেম্বর সেলিম খান অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান, কিন্তু এরপরই তিনি পালিয়ে যান। ২০১১ সালে দিল্লি হাইকোর্ট তার সাজা বহাল রাখে, কিন্তু তখনও তিনি পলাতক ছিলেন। এর মধ্যে সেলিম খান নিজেকে মৃত ঘোষণা করে নতুন পরিচয় নেন। তিনি সেলিম ওয়াস্তিক এবং সেলিম আহমেদ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পরবর্তী ১০ বছর তিনি হরিয়ানার করনাল ও আম্বালার মতো এলাকায় লুকিয়ে থেকে পোশাক তৈরির কাজ করতেন। ২০১০ সালে তিনি গাজিয়াবাদের লোনি এলাকায় ফিরে আসেন এবং সেখানে একটি নারীদের পোশাকের দোকান খোলেন।

সেই সঙ্গে ইউটিউবে কনটেন্ট তৈরি শুরু করেন। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি একজন সামাজিক কর্মী ও ইউটিউবার হিসেবে পরিচিতি পান। এ সময় সন্ত্রাসবাদ ও ধর্ম নিয়ে তার কিছু বক্তব্য ও ভিডিও বিতর্কিত হয়।

এক পর্যায়ে তার জীবনকাহিনী দেখে একজন বলিউড প্রযোজক তার ওপর একটি বায়োপিক বানানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং এজন্য তাকে ১৫ লাখ রুপি অগ্রিমও দেয়া হয়েছিল। তবে সেটা তৈরি হওয়ার আগেই তিনি গ্রেফতার হয়েছেন।

গত মাসে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে নিজ বাড়িতে সেলিম ওয়াস্তিকের ওপর হামলা হয়। দুই ব্যক্তি তাকে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুই হামলাকারী তার বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করছে।

প্রায় চার মিনিটের ওই ভয়াবহ ভিডিওতে দেখা যায়, সেলিম সোফায় বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিলেন। ঠিক তখনই কুর্তা-পাজামা ও জ্যাকেট পরা দুই ব্যক্তি কাঁচের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে। তারা নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে করে আসে এবং হেলমেট খুলেনি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা সেলিমকে ছুরিকাঘাত শুরু করে। মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, তবুও হামলাকারীরা আঘাত চালিয়ে যেতে থাকে।

হামলাকারীদের বলতে শোনা যায়, ‘তুমি আমাদের নবীকে অপমান করছ, তুমি আমাদের আল্লাহকে অপমান করছ।’ কর্তৃপক্ষ জানায়, সেলিমের গলা, পেট ও কানে গুরুতর আঘাত লাগে। ঘটনাস্থলের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা তার গলা কাটারও চেষ্টা করেছিল।

পরবর্তীতে আশপাশের বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে কাছের একটি ৫০ শয্যার হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাকে দিল্লির গুরু তেজ বাহাদুর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তার চিকিৎসা চলে।

এই ঘটনায় সেলিমের ছেলে উসমান জিশান ও তার ভাই গুলফাম নামে দুইজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। দুই হামলাকারীর মাথার ওপর ১ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পরে পুলিশের সঙ্গে পৃথক বন্দুকযুদ্ধে দুজনই নিহত হয়—জিশান ১ মার্চ এবং গুলফাম ৩ মার্চ মারা যায়