সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ৯ জন নিহতের ঘটনায় দুই বাসের চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬ জন।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে নিহত সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভের বোনের জামাই মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ওসমানীনগর থানায় মামলাটি করেছেন।
বিষয়টি কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন ওসমানীনগর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটে ওসমানীনগর উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঢাকামুখী ইউনিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি এসি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাস দুটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় ইউনিক পরিবহনের যাত্রী সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), আবুল (৪৩), হাজী সাইফুল ইসলাম (৫০), ইসরাত জাহান পেহলি (১৯), মো. আরমান হোসেন রাহিম (১৯), সাইফুল ইসলাম ইমন (৩২) ও রুবেল সূত্রধর (৩৭) ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোছা. জাইফা ইসলাম তানহা (৩) ও সপ্তম রায় (২২) মারা যান। এতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ জনে। দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
এজাহার অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৬ জন আহতকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে বাস দুটির আরও ১২ থেকে ১৩ জন যাত্রী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মামলার এজাহারে দুই বাসের অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি ওভারটেকিং করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। সংঘর্ষের পর দুই বাসের চালকই ঘটনাস্থলে বাস রেখে পালিয়ে যান। দুর্ঘটনার পর শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি জব্দ করে হেফাজতে নেওয়া হয়। নিহতদের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়ে কোনো সন্দেহ না থাকায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সিলেটের অনুমতি নিয়ে মরদেহগুলো বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই চালকের নাম-ঠিকানা সংগ্রহের চেষ্টা করতে গিয়ে মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। মামলায় বেঙ্গল পরিবহনের এসি বাস ঢাকা মেট্রো-ব-১২-৫৯৮৭ এবং ইউনিক পরিবহনের বাস ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-২৫৬৩-এর অজ্ঞাতনামা দুই চালককে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদী মনিরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ওসমানীনগরে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার প্রিয় ভাইকে হারিয়েছি। দুই চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও চরম গাফিলতির কারণে নয়টি পরিবার আজ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের দুটি অবুঝ সন্তান রয়েছে। একজনের বয়স সাড়ে তিন বছর, অন্যজনের মাত্র ১২-১৩ মাস। বাবাকে হারিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা চাই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই অজ্ঞাত চালককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো চালক বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার সাহস না পায়।
তিনি বলেন, উপার্জনক্ষম স্বজন হারানো নয়টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে অবুঝ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে টেকসই ও উপযুক্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা আর কোনো মায়ের কোল খালি কিংবা কোনো শিশুর মাথার ওপর থেকে পরিবারের ছায়া সরে যেতে দেখতে চাই না।
ওসমানীনগর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা কালবেলাকে বলেন, দুর্ঘটনার ঘটনায় শনিবার রাত ১২টার পর মামলা হয়েছে। মামলায় দুই বাসের দুই চালককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে বাস দুটির চালকদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, নিহতদের মধ্যে একজনের ভাই বা আত্মীয় মামলাটির বাদী হয়েছেন। আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের ধরতে শেরপুর হাইওয়ে থানার সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে।












