কুমিল্লারবিবার, ৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কুমিল্লায় গৃহবধূর খণ্ডিত লাশ: আটক নারী শিশু হত্যা মামলায় জামিনে ছিলেন

প্রতিবেদক
Cumilla Press
আগস্ট ৯, ২০২৬ ৬:২৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলায় গৃহবধূ ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার পাঁচ বছর আগের এক শিশু হত্যা মামলারও আসামি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শনিবার কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার ছোট আলমপুর পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ‘ভূঁইয়া হাউসে’ এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে নিহত ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহের বিভিন্ন অংশ পলিথিনে মোড়ানো অবস্থার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

৫৫ বছর বয়সী ফরিদা ওই বাড়ির মালিক এবং দেবিদ্বার পৌরসভার ফতেহাবাদ গ্রামের মো. মফিজুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। মফিজুল ইসলাম চট্টগ্রামে একটি জাহাজে কর্মরত।

ফরিদা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় আসা লাইলী আক্তারের বিরুদ্ধে এর আগে দেবীদ্বার এলাকায় সাত বছর বয়সী ফাহিমা নামের এক শিশুহত্যার ঘটনায় ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর মামলা হয়। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে লাইলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

পরে জামিনে মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই লাইলীর বিরুদ্ধে আরেকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী আক্তার ফরিদা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনের নামও তিনি জানিয়েছেন।

মামলার এজাহার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর দেবিদ্বার উপজেলায় বাবাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় পাঁচ বছরের শিশু ফাহিমাকে গলা কেটে হত্যা করে একটি খালে পুঁতে রাখা হয়। ঘটনার সাত দিন পর

পুলিশ একটি খাল থেকে শিশুটির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করে র‌্যাব। পরে শিশুটির বাবা আমির হোসেন, তার পরকীয়া-সম্পর্কের অভিযোগ থাকা লাইলী আক্তার, রবিউল আউয়াল, রেজাউল ইসলাম ইমন ও সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্ত চলাকালে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই মামলায় প্রায় সাড়ে চার বছর কারাভোগের পর কয়েক মাস আগে জামিনে মুক্তি পান আসামিরা।

ফাহিমা হত্যা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে বাড়ির মালিক ফরিদা বেগমকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো টুকরো করে একাধিক পলিথিনে ভরে রাখার অভিযোগে আবারও লাইলী আক্তারসহ আগের মামলার কয়েকজন আসামির নাম সামনে এসেছে। এ ঘটনায় পুলিশ লাইলীকে আটক করেছে। তবে বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন।

দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া (সার্কেল) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. শাহীন বলেন, “লাইলী আক্তার ২০২১ সালে শিশু ফাহিমা হত্যাকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। সে কয়েক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে ছাড়া পায়। এরপর বিভিন্ন জায়গা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। প্রায় ১২ দিন আগে এই বাসায় ভাড়ায় উঠেন তিনি।

“ধারণা করা হচ্ছে, বাড়ির মালিকের স্বর্ণলংকারের লোভে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের আরও কয়েকজনের নাম পেয়েছি তাদেরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার সারাদিন ফরিদা ইয়াসমিনের খোঁজ না পেয়ে তার ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার বাড়িতে আসেন। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পরও মায়ের সন্ধান না পেয়ে তিনি ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় লাইলীর কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশে খবর দেন তিনি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির পেছন থেকে ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার পর স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা লাইলী আক্তারকে আটক করে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করে। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে বিক্ষুব্ধ লোকজন আবারও তার ওপর হামলার চেষ্টা করলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে তাকে থানায় নেওয়া হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফরিদা ইয়াসমিনের দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা স্বামীর বাড়িতে থাকতেন। প্রায় ১০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম খলিলের মৃত্যু হলে এরপর থেকে তিনি বাড়িতে একাই বসবাস করতেন।

ঘটনার মাত্র ১২ দিন আগে লাইলী আক্তার ওই বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া নেন। পরে তিনি বাড়ির মালিক ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার ও টাকা-পয়সার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করেন।

স্থানীয়দের দাবি, শুক্রবার রাতে লাইলী আক্তার নিজেই তাদের জানান, তিনি তার স্বামী আবুল কালামসহ রবিউল, সোহেল ও ইমনকে ডেকে এনে ফরিদা ইয়াসমিনকে হত্যা করেছেন। পরে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করে একাধিক পলিথিন ব্যাগে ভরে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখা হয়। তবে রোববার পর্যন্ত মরদেহের মাথা ও দুই পা উদ্ধার হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নিহতের মেয়ে মরিয়ম আক্তার বলেন, “আমরা দুই বোনের বিয়ের পর মা বাড়িতে একাই থাকতেন। শনিবার সকালে বাবা ফোন করে জানান, মায়ের ফোনে কল গেলেও তিনি ধরছেন না। এরপর আমি বাড়িতে এসে আত্মীয়স্বজনের বাসাসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করি। পরে ভাড়াটিয়া লাইলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হয়।

“একপর্যায়ে বারান্দার মেঝেতে ধোয়া-মোছার চিহ্ন, ভেজা ফ্লোর এবং দরজায় ছোট ছোট রক্তের দাগ দেখে আমার সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপর লাইলীকে ঘরে আটকে রেখে পুলিশে খবর দিই। পরে বাড়ির চারপাশে খোঁজাখুঁজির সময় বাড়ির পেছনে পলিথিনে মোড়ানো মাংসের টুকরো দেখতে পাই। পুলিশ এসে সেগুলো উদ্ধার করে। পরে পুলিশের কাছে জানতে পারি, সেগুলো আমার মায়ের মরদেহের অংশ।”

নিহত ফাহিমার মা হোসনেয়ারা বেগম বলছেন, “আমি জানি না লাইলী কেমনে জেল থেকে বের হলো। ফাহিমাকে মারার সাজা হয় নাই বলেই তো সে আরেকটা খুন করার সাহস পাইলো। আমি তার ফাঁসি চাই।”

স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুর রহমান ও প্রতিবেশী শিক্ষিকা নিলুফা আক্তার বলেন, “দেবিদ্বারে শিশু ফাহিমাকে লাইলীসহ যে পাঁচজন গলাকেটে হত্যা করেছিল, ফরিদা ইয়াসমিনকেও একই আসামিরা হত্যা করেছে। লাইলী প্রকাশ্যে জবানবন্দিতে তাদের নাম বলেছে। তারা ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের জড়িত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে শুনেছি। কিন্তু তাদের বিচার শেষ না হতেই জামিন দেয়। যার কারণে ফরিদা ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো।”

এ বিষয়ে দেবিদ্বার থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, “শিশু ফাহিমা হত্যা মামলায় পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যে ফরিদা ইয়াসমিন হত্যা মামলায়ও ফাহিমা হত্যা মামলার আসামি লাইলী আক্তারসহ চারজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

“ফাহিমা হত্যা মামলায় তারা প্রায় চার বছর কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পান।”

তিনি বলেন, “তবে মামলাটির রায় কেন এখনো হয়নি, সে বিষয়ে আদালতই বলতে পারবেন। মামলা জট, সাক্ষী হাজিরে বিলম্ব বা বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে রায় হতে সময় লাগতে পারে।”