সংসারের অভাব ঘোচাবেন, ধারদেনা শোধ করবেন, স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে একটু সচ্ছল জীবন কাটাবেন— এমন স্বপ্ন নিয়েই প্রায় দেড় বছর আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন জাকির হোসেন। সেখানে গিয়ে চাকরিও পেয়েছিলেন। পরিবারের ঋণ শোধের পাশাপাশি নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছিলেন বাড়িতে। সম্প্রতি চাকরিতে পদোন্নতিও হয়েছিল তার। পরিবারে তখন নতুন করে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল।
কিন্তু সেই আলো নিভে গেল এক বিস্ফোরণে। রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের একটি গ্যাস কেমিকেল কমপ্লেক্সে গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন জাকির। গত বুধবার (২৬ আগস্ট) রাশিয়ার স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
তার মৃত্যুর খবর বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় ভৈরবের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই সেখানে চলছে আহাজারি। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তানসহ পরিবারটি এখন দিশেহারা।
জাকির হোসেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের মৃত রতন মিয়ার বড় ছেলে। জাকিরের স্ত্রী ও একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে থাকাকালে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করতেন জাকির। কিন্তু তাতে সংসারের অভাব কাটছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে প্রায় দেড় বছর আগে রাশিয়ায় যান তিনি।
রাশিয়ায় আমুর অঞ্চলে এলএনজি সিনোপেক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের অধীন একটি গ্যাস কমপ্লেক্সে চাকরি নেন জাকির। সেখানে তার উপার্জনে সংসারের খরচ চলার পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণও ধীরে ধীরে পরিশোধ হচ্ছিল।
স্বজনরা জানান, সম্প্রতি চাকরিতে পদোন্নতি পাওয়ার পর পরিবারে স্বস্তি ফিরেছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছিলেন সবাই। এর মধ্যেই গত বুধবার ওই গ্যাস কমপ্লেক্সে গ্যাস লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে জাকির নিহত হন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। মুহূর্তেই আনন্দের পরিবেশ বদলে যায় শোকে।
জাকিরের চাচাতো ভাই মাহবুবুর রহমান বলেন, জাকিরের পরিবার অত্যন্ত অসহায় ও অস্বচ্ছল। দেশে থাকাকালে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালাতেন। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে চাকরি করে পরিবারের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুতে পরিবারটি একদিকে উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছে, অন্যদিকে মাথার ওপর ঋণের বোঝাও রয়ে গেছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, জাকিরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, রাশিয়ায় গ্যাস বিস্ফোরণে জাকির হোসেনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে পরিবারটির আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি জানা গেছে।
ইউএনও জানান, জাকিরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের প্রথম প্রচেষ্টা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অসহায় পরিবারটি যাতে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা পায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।












