“আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো আপস করব না। জুলাই নিয়েও কোনো আপস করব না। এগুলোর বিরুদ্ধে যারা, আমরাও তাদের বিরুদ্ধে।”
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ উপলক্ষে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত প্রায় ১টা পর্যন্ত চলে এই উত্তেজনা। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান জানান, ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে টাঙানো একটি ব্যানার নিয়ে ‘ছাত্রদলের আপত্তি’কে কেন্দ্র করেই দুপক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াতের সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়।
খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ব্যানারটি সরানোর দাবি জানালে দুপক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি নীরবসহ কয়েকজন শিবিরের এক কর্মীকে ‘লাথি’ মারেন। পরে গাছের ডাল ভেঙে হামলা চালানো হয়। এ সময় শিবির নেতা মেহেদী হাসানকে স্টাম্প দিয়ে মারধরও করা হয়। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়েন।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিকের অভিযোগ, প্রদর্শনীতে টানানো ব্যানার নামিয়ে ফেলতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর ‘চাপ সৃষ্টি’ করেন। তারা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিতে বললেও ছাত্রদল তাতে কর্নপাত না করে ‘হামলা’ চালায়।
শিবলীর ভাষ্য, “ছাত্রদল আমাদের কয়েকজন ভাইকে মারধর করে আহত করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আসলে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হলে আমরা থেমে যাই। তখন ছাত্রদলও চলে যায়। কিন্তু তারা হঠাৎ আবার অতর্কিত হামলা চালায়। লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে আক্রমণ শুরু করলে আমরাও প্রতিহত করার চেষ্টা করি।”
তবে ছাত্রদলের দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাসে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রতিবাদ জানালে তাদের সহ-সভাপতি আশিকের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে বহিরাগত ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, “ছাত্রশিবিরের প্রদর্শনীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবির পাশে গোলাম আজম, কাদের মোল্লা ও মতিউর রহমান নিজামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো হয়েছিল।
“বিষয়টি আমাদের নজরে এলে আমরা ওই ছবিগুলো সরিয়ে নিতে বলি। এরপরই তারা চেয়ার নিক্ষেপ করে, ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় এবং আমাদের একজন আহত হয়।”
তিনি বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো আপস করব না। জুলাই নিয়েও কোনো আপস করব না। এগুলোর বিরুদ্ধে যারা, আমরাও তাদের বিরুদ্ধে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুর রাকিব মুরাদের দাবি, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে তারা আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।
একটি ব্যানার নিয়ে আপত্তি তুলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি ‘পণ্ড করতে’ এসে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন ইসলামও একই অভিযোগ করেন। তার দাবি, ছাত্রশিবিরের প্রদর্শনীতে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি সংবলিত ব্যানার টাঙানো হয়েছিল। ওই ব্যানার অপসারণের দাবি জানানো হলে শিবিরের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।
সংর্ষের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকাত আলী বলেন, “এ ঘটনার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। এবং বিশেষ করে যারা আহত হয়েছেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সার্বিক সহযোগিতা করব।”
এ সময় তিনি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “তারা বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং কোনো অশুভ শক্তি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।”
ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ক্যাম্পাসে পৌঁছায়। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ‘হাতাহাতির’ ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”












