রোদেলা দিন। তাপমাত্রাও চড়া। বারিধারা থেকে মালিবাগ, টিএসসি হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে ঘামে ভিজল শরীর; সময় গড়াল দুপুরে। চারপাশে অসুস্থ মানুষের ভিড়, হাসপাতালের চেনা গন্ধ আর ব্যস্ততা জানান দিচ্ছিল, ঢামেকে এসে গেছি। খুঁজতে হবে কবি ও অভিনেতা রিফাত চৌধুরীকে। হাসপাতালেরই এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সন্ধান মিলল তার।
হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর। কোথাও রোগীর স্বজনের ছোটাছুটি, কোথাও চিকিৎসকের তাড়া, কোথাও রিপোর্ট হাতে অপেক্ষা। সেই ভিড়ের মাঝে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেন রিফাত চৌধুরী। টানা একশ গজের বেশি হাঁটতে পারেন না। কিছু দূর গিয়েই থামতে হয়, বসে একটু জিরিয়ে নিতে হয়। কোমর থেকে পা পর্যন্ত যেন শরীরেরই এক অংশ আরেক অংশকে পথ দেখাতে ভুলে গেছে।
সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন রিফাত। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরও শুরুতে বেড পাওয়া যায়নি। ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর থাকতে হয়েছে ফ্লোরে। পরে কোনোমতে একটি বেডের ব্যবস্থা হয়। সেখানেই আপাতত কাটছে এই গুণীর দিন।
হাসপাতালে আমার সঙ্গে পরিবারের কেউ আসেনি। আমার কবি বন্ধু, চিকিৎসক অমিতাভ অরণ্য আছে। পরিবারের কেউ আসেনি, কারণ আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।


রিফাত জানান, শরীরের অসুস্থতা যতটা না তাকে থামিয়ে দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি যেন তাকে আটকে রেখেছে চিকিৎসার প্রক্রিয়া। ভর্তি হওয়ার কয়েক দিন পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চিকিৎসা শুরু হয়নি। কারণ, যে ফাইল দেখে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখবেন, সেটিই তখনো তৈরি করতে পারেননি তিনি। শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে রিফাত বললেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে আমি অসুস্থ। বলতে গেলে, অচল অবস্থায় আছি। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারি না। ১০০ গজ হাঁটার পরই আমাকে বসে বিশ্রাম নিতে হয়। আমার মূল সমস্যা পায়ে এবং কোমরে। ঠিকমতো চলাচল করতে পারছি না।’
পৃথিবীর সমস্ত মানুষই অনেক মূল্যবান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনে যেরকম মূল্যবান, আমিও মূল্যবান। কিন্তু তিনি আমাকে খাটো করে দিয়েছেন। আমি তার অফিসে গিয়েও দেখা করতে পারিনি।
এই ‘অচলাবস্থা’ নিয়েও চিকিৎসার জন্য তাকে ছুটতে হয়েছে। এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে যাওয়া, রক্ত দেওয়া, রিপোর্ট সংগ্রহ, সবই করতে হয়েছে প্রায় একা। সহযোগিতা করেছেন অনুজ বন্ধু ও চিকিৎসক অমিতাভ অরণ্য। রিফাত বলেন, ‘একটু আগে (সোমবার) রক্ত দিয়ে এসেছি। আমার এই অনুজ বন্ধু রিপোর্ট নিয়ে আসলেন। আবার বিকেলে যেতে হবে আরেক জায়গায়। মানে, এইভাবে ডিপার্টমেন্টে ছোটাছুটি করছি। ফাইলটা তৈরি হয়ে গেলেই আমার বোধ হয় চিকিৎসাটা শুরু হতে পারে।’
রিফাত চৌধুরী একজন কবি, অভিনেতা; রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। দেশের বৃহত্তম হাসপাতালে তার জন্য কি একটি কেবিন পাওয়া যাবে না? এইটুকু আশা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অনেকটা সময় অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত তার দেখা পাননি অভিনেতা।


রিফাত চৌধুরীর কথায়, “পৃথিবীর সমস্ত মানুষই অনেক মূল্যবান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনে যেরকম মূল্যবান, আমিও মূল্যবান। কিন্তু তিনি আমাকে খাটো করে দিয়েছেন। আমি তার অফিসে গিয়েও দেখা করতে পারিনি। উনি কিন্তু বললেন, ‘দুইটার মধ্যে আপনি অফিসে আসবেন।’ আমি গেলাম। কিন্তু উনি তখন অন্য জায়গায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কী বলব, ব্যস্ত মানুষ, ব্যস্ততার মধ্যেই থাকবে, এটাই হয়তো স্বাভাবিক।”
মিডিয়ায় যারা থাকে, তারা তো নিউজের ব্যাপারে সচেতন। তাদের কাছে খবর চলে যায়। নিশ্চয়ই খবরটবর পেয়েছে। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। যারা যোগাযোগ করেছে, তারা মূলত গণমাধ্যমকর্মী। তারাই এসে আমার খবর নিয়েছেন, সংবাদ প্রকাশ করছেন।
তবে হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-৩-এ কর্মরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পর কেবিনের বিষয়ে আশ্বাস মিলেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন, রাতের মধ্যেই কেবিনে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হবে।
একাকীত্বের সঙ্গে সংসার
বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিফাত চৌধুরীর অসুস্থতার খবর প্রকাশিত হয়েছে পারিবারিক সূত্র দিয়ে। অথচ এই অসুস্থ অধ্যায়ে, চিকিৎসার ছুটোছুটিতে রিফাত মূলত একা। কারন তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি নিজেই বললেন, ‘হাসপাতালে আমার সঙ্গে পরিবারের কেউ আসেনি। আমার কবি বন্ধু, চিকিৎসক অমিত অরণ্য আছে। পরিবারের কেউ আসেনি, কারণ আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।’
এই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যেন বহু বছর ধরেই অভ্যস্ত তিনি। বরং একা থাকার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন এক ধরনের নিরাপত্তা। তিনি বলেন, ‘একা থাকা এমন একটা বিষয়, এটা সবাই অর্জন করতে পারে না। আমি এটা অর্জন করে ফেলেছি। যার ফলে আমি আসলে একা থাকতে অনেক ভালোবাসি। একা থাকা অনেক নিরাপদ। সেই ছোটবেলা থেকে একা থাকার কাছাকাছি। আমার বয়স এখন ৬৫। বয়স যখন ১২, তখন থেকেই আমি নিঃসঙ্গ, একা। তাছাড়া প্রত্যেকটা মানুষই তো একা। যখন আপনি কাজ শেষে রাতে ফিরে যাবেন, তখন একাই ফিরবেন। এখন হয়তো আপনি একা নেই। পাশে সহযোগীরা আছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখবেন, সবাই সব জায়গায় চলে গেছে। আপনিও একা। একা পথিক তার ঘরে ফিরে যাবে। সে অর্থে তো আমরা প্রত্যেকেই একা।’
অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছি। কিন্তু পারিশ্রমিকে ওরা আসলে আমাকে ঠকিয়েছে। আমার সরলতা এবং আমার নীরবতাকে পুঁজি করে প্রযোজক এবং পরিচালকরা এসব করেছে। ওরা আসলে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ওরা আমার ন্যায্য পাওনা আমাকে দেয়নি।


আলাপের মধ্যে কাব্যিক আবহ এসে পড়েছে স্বভাবতই। তিনি নিজস্ব ঢঙে বলে গেলেন, ‘মানুষ দল বেঁধে জন্মায় না, দল বেঁধে পৃথিবী থেকে বিদায়ও নেয় না। সে অর্থে প্রত্যেক মানুষই একা। শুধু মানুষ না, সৃষ্টিকর্তাও একা, নিঃসঙ্গ। মানে আমার মস্তিষ্কের বাক্সের মধ্যে একাকী। একটা তারা যেমন একা, অনেক আলোকবর্ষ দূরে আরেকটা তারা আছে, তার পাশাপাশি নেই। কোটি কোটি বছর যাবৎ একা অবস্থান করছে। আকাশের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন। গ্রহ, নক্ষত্র যদি একা থাকে, সেখানে আমার একাকীত্ব তো কিছুই না। তাই না?
অভিনয়জগত নিয়ে আক্ষেপ ও ক্ষোভ
পরিবার না হয় নেই, কিন্তু যে অভিনয়জগতে তিনি এতটা বছর কাজ করলেন, সেখানকার কেউ তো অন্তত খোঁজ নিতে পারে, পাশে থাকতে পারে। প্রসঙ্গ তুলতেই আক্ষেপের সুর রিফাত চৌধুরীর কণ্ঠে, ‘আমি যে অসুস্থ, এটা অভিনয়শিল্পী সংঘ বা সংশ্লিষ্টরা জানে। কারণ নিউজ তো হয়েছে। মিডিয়ায় যারা থাকে, তারা তো নিউজের ব্যাপারে সচেতন। তাদের কাছে খবর চলে যায়। নিশ্চয়ই খবরটবর পেয়েছে। কিন্তু আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। যারা যোগাযোগ করেছে, তারা মূলত গণমাধ্যমকর্মী। তারাই এসে আমার খবর নিয়েছেন, সংবাদ প্রকাশ করছেন।’
পাঁচ শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন রিফাত চৌধুরী। চাট্টিখানি কথা নয়। এত কাজ, তবু এমন মানবেতর জীবন কেন? এর পেছনেও রয়েছে শোবিজের চিরচেনা সীমাবদ্ধতা। পার্শ্ব চরিত্র করেছেন, তাই পারিশ্রমিক ছিল কম; আবার যেটুকু ছিল, তাও ঠিকঠাক মিলতো না। অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই রিফাত বলেন, ‘অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছি। কিন্তু পারিশ্রমিকে ওরা আসলে আমাকে ঠকিয়েছে। আমার সরলতা এবং আমার নীরবতাকে পুঁজি করে প্রযোজক এবং পরিচালকরা এসব করেছে। ওরা আসলে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ওরা আমার ন্যায্য পাওনা আমাকে দেয়নি।’


সেই অর্থাভাবে এখন ধুঁকতে হচ্ছে রিফাতকে। বললেন, ‘আমার কাছে কিন্তু কোনো টাকা-পয়সা নেই। ডাক্তারকে একটা টাকাও দিতে পারি না। এর মধ্যে আমার চিকিৎসা চলছে মানুষের ভালোবাসায়।’
যাদের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের নিয়ে রিফাতের মন্তব্য এরকম, ‘আমি এটা বিশ্বাস করি, আমার পাওনা যেটা, তা জীবিত অবস্থায় হলেও দিতে হবে, মৃত্যুর পর হলেও দিতে হবে। আর সেটা যদি সে না দেয়, তাহলে আমার ওই টাকা তাকে ডাক্তারকে দিতে হবে। ডাক্তার বসে আছে ওই টাকা নেওয়ার জন্য।’
এ অবস্থায় সরকারি কোনো সহায়তা চান কিনা? প্রশ্নটা শুনতেই স্রেফ ‘না’ করে দিলেন রিফাত চৌধুরী, ‘সরকার আমাকে যদি হেল্প করতে চায়, আমি প্রত্যাখ্যান করব। আমি সরকারি কোনো সহযোগিতা চাই না। সরকার আমাকে সাহায্য করবে কেন? সে জনগণের টাকায় চলে। সে আমাকে কী দেবে। তবে যদি মানুষ ভালোবেসে কিছু দিতে চায়, সেটা নেব।’
দু-তিনবেলা যেরকম খাবার খেতে হয়, তেমনি আমাকে একবেলা কবিতাও খেতে হয়। লেখালেখি আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আমার কাছে মনে হয় না যে, কবিতা আমাকে ত্যাগ করে যাবে। কারণ কবিতার একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হলাম আমি।
লেখালেখিই তার আসল আশ্রয়
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শত শত নাটকে অভিনয় করেছেন রিফাত চৌধুরী। কিন্তু অভিনয়কে কখনো নিজের প্রথম পরিচয় হিসেবে দেখেননি, তার কাছে নিজের প্রধান কাজ লেখালেখি। রিফাতের কথায়, ‘আমার প্রধান প্যাশন লেখালেখি। অভিনয় করতে গিয়েছি টাকার জন্য। কারণ কে কাকে বাঁচায়? বাঁচতে তো হবে। লেখালেখি তো আমাকে টাকা দেয়নি। ওই মিডিয়াতে গিয়েছি টাকার জন্য।’
এত পথ পাড়ি দিয়ে এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছেও নেই রিফাতের। তার ভাষ্য, ‘বয়স হয়েছে, আর অভিনয়জগতে ফিরতে আমার আগ্রহ নেই। আমার শরীরও সাপোর্ট করছে না। মিডিয়াতে এখন যারা কাজ করছে, তারা সবাই ঘোলা জলে মাছ ধরছে। আমি আসলে ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাই না। স্বচ্ছ জলের মাছ ধরা অনেক ভালো।’


অভিনয় তাকে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু কবিতাই তার কাছে জীবনের গভীরতম আশ্রয়। কবিতাকে তিনি তুলনা করেছেন প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে। ‘দু-তিনবেলা যেরকম খাবার খেতে হয়, তেমনি আমাকে একবেলা কবিতাও খেতে হয়। লেখালেখি আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আমার কাছে মনে হয় না যে, কবিতা আমাকে ত্যাগ করে যাবে। কারণ কবিতার একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হলাম আমি।’
‘পরিচয়হীন’ রিফাত চৌধুরী
রিফাতের জীবনদর্শনের আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায় তার রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব নিয়ে ভাবনা। তিনি জানিয়েছেন, নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিছুই রাখেননি। এমনকি শুটিংয়ের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ এলেও শুধু পাসপোর্ট না থাকায় যেতে পারেননি। তার ভাষ্য, ‘আমি যদি এ দেশের নাগরিক হই, তাহলে আমাকে সরকার একটা হোল্ডিং নম্বর দেবে। যেহেতু সরকার আমাকে কোনো হোল্ডিং নম্বর দেয়নি, সেহেতু আমি এ দেশের নাগরিক নই।’
এই অবস্থান থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও তার তীব্র আপত্তি। তার কথায়, ‘এখন যে জাতীয় পরিচয়পত্র; আইডেন্টিটি বলতে একটা কার্ড, একটা নম্বর—এটা আসলে বোগাস, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমার হোল্ডিং নম্বর নেই, আমার পাসপোর্ট নেই, আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। যাবতীয় এসব প্রয়োজনীয় জিনিস আমি প্রত্যাখ্যান করেছি।’












