কুমিল্লাসোমবার, ৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ে মৃত্যু

প্রতিবেদক
Cumilla Press
আগস্ট ৩, ২০২৬ ৮:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শোকে বিহ্বল গোটা পরিবার। কিন্তু সেই শোকের মধ্যেও জ্বলছে ক্ষোভের আগুন।

অক্ষর সৌভিক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছে না তার পরিবার। তবু চোখের জলে ভাইয়ের মুখাগ্নি দিতে হয়েছে ছোট বোন শীর্ষা রায়কে। 

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের সময় দড়ি ছিঁড়ে মারা যাওয়া খুলনার তরুণ অক্ষর সৌভিক রায়ের মরদেহ সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল ১১টা ১১ মিনিটে লাশবাহী গাড়িতে খুলনায় পৌঁছায়।

মরদেহ প্রথমে নগরীর শহীদ হাদিস পার্কের পাশে ছয়তলা ভবন দোলনের সামনে কিছু সময় রাখা হয়। পরে ভবনটির চতুর্থ তলার ভাড়া বাসা থেকে নেমে আসেন শোকাহত মা, ছোট বোন ও স্বজনরা। মৃত অক্ষরকে একনজর দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। 

এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে।

প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। শোকে বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন মা শুক্লা রায়।

এরপর মরদেহ নেওয়া হয় রূপসা মহাশ্মশানে। দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে অক্ষরের চাচা সাত পাক ঘুরে আগুনের মশাল তুলে দেন ছোট বোন শীর্ষা রায়ের হাতে। দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে ভাইয়ের চিতায় মুখাগ্নি করেন শীর্ষা।

অশ্রুসিক্ত সেই মুহূর্তে শেষ বিদায় জানানো হয় অক্ষরকে।

মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, অক্ষরের ভগ্নিপতি আলিমুজ্জামান সিফাত। তার স্ত্রী মেধা মৃত্তিকা রায় অক্ষরের বড় বোন। তিনি বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কক্সবাজারে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। সেই অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছেন অক্ষর। এ জন্য অক্ষরের বোন কক্সবাজার সদর থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।

আলিমুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, দুর্ঘটনার দায় কি শুধু প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের? তার অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই অক্ষরের মৃত্যুর পথ তৈরি করেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তার মা ও বোন।

আলিমুজ্জামান জানান, প্যারাসুটের দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার পর অক্ষর সাগরে পড়ে মারা যান। ঘটনার ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তার অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকেই পরে বলা হয়েছে অক্ষর যে প্যারাসেইলিংয়ে উঠেছিলেন, সেটি অবৈধ ছিল। যদি সেটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতে হবে।

‘মানুষ আনন্দ ও বিনোদনের জন্য কক্সবাজারে যায়। সেখানে বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ভেবে পর্যটকরা এসব সেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেই দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। তাই জেলা প্রশাসন ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে’—বলেন আলিমুজ্জামান। তিনি অক্ষরের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের সঠিক বিচার দাবি করেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জুনে অক্ষরের বাবা মারা যান। এরপর থেকেই পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন অক্ষর। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে বর্তমানে লোয়ার যশোর রোডের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন তারা। অক্ষরের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

অক্ষরের স্কুলবন্ধু রিফাত হাসান শুভ বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণের মূল্য আছে। আমরা জীবনের মূল্য চাই। অক্ষর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। এখন তার মা ও দুই বোন কিভাবে বাঁচবে? সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।’

রিফাত জানান, গত ৩১ জুলাই ছিল অক্ষরের প্রয়াত বাবার জন্মদিন। সেদিন বাবাকে স্মরণ করে ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন অক্ষর। এর পরদিনই প্রাণ হারান তিনি।

আরেক বন্ধু মোস্তফা আমিন তনু বলেন, ‘আগের দিনও অক্ষরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। পরদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুর মৃত্যুর ভিডিও দেখতে হয়েছে। আমার বন্ধু তো আর ফিরে আসবে না।’

তনুর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের আচরণও হতাশাজনক ছিল। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা গাড়িতে উঠে চলে যান বলেও দাবি করেন তিনি।

স্বজনদের দাবি, অক্ষরের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংসহ সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর নিরাপত্তা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বহন করতে না হয়।