কুমিল্লারবিবার, ১১ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এলো তাজমিন হত্যার যেসব তথ্য

প্রতিবেদক
Cumilla Press
অক্টোবর ১০, ২০২৬ ১:৩১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, গত ৭ অক্টোবর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার কথা থাকলেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লালমাই উপজেলার জগতপুরের একটি ধানক্ষেতে। সেখানে তাকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, তাজমিন হত্যার উদ্দেশ্য অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। পরে সে কক্সবাজারে যায়। বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরের পর বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয় কিশোরীটি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে। রাত ১২টা ১৯ মিনিটে ওই এলাকায় তাকে সর্বশেষ দেখা যায়।

এরপর বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে তাজমিন। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, চালক সুমন শহরের দিকে না গিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালাতে থাকেন। একপর্যায়ে বিষয়টি বুঝতে পেরে বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠায় তাজমিন এবং নিজের লাইভ লোকেশন শেয়ার করে। রাত ২টা ৫৮ মিনিটে পাঠানো ওই বার্তায় তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে ঘুমিয়ে থাকায় তখন বার্তাটি দেখতে পাননি তার বাবা আবদুল আলীম।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটি বিজরা হয়ে রসুলপুর ও শিকারীপাড়া দিয়ে জগতপুরের ধানক্ষেতের দিকে যায়। সেখানে তাজমিনের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে সে পালানোর চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। শুরুতে চালক সুমন একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে ধারণা করা হলেও পরে মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণে একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার সকালে জগতপুরের ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়। গাড়িটির নিবন্ধন ও মালিকের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে গাড়ির মালিক জানান, সুমন সেটি ভাড়ায় চালাতেন। পরে তার অবস্থান শনাক্ত করে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। তার বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যাচ্ছিল না।

এদিকে মেয়ের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। শুক্রবার যশোরের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাদের বাড়িতে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

কেয়া খাতুন অভিযোগ করেন, মেয়ের এক বান্ধবী তাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত। মেয়েকে নিরাপদে রাখতে অনেক চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি। তার অভিযোগ, ওই বান্ধবীই তাজমিনকে কক্সবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে মেয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল। সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের পাঠানো বার্তা ও লাইভ লোকেশন দেখতে পান তিনি। পরে লোকেশন অনুসরণ করে মেয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।

তাজমিনের হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, কী উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তের বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরার কথা রয়েছে।