কুমিল্লাসোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আমার ফড়িং আর ছবি তুলবে না, অপ্রতিমের মায়ের আহাজারি

প্রতিবেদক
Cumilla Press
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ ১০:১০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

একমাত্র সন্তান অপ্রতিমকে হারিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের আহাজারি।

অপ্রতিম, আমার রুহটাও নিয়া গেলা তুমি। আমার ফড়িংটা ছবি তুলতে পছন্দ করত। সে আর ছবি তুলবে না। আমার রুহটাও চলে গেছে আমার ছেলের সঙ্গে। আমার দেহটা আছে, প্রাণটা নেই রে।

এভাবেই একমাত্র সন্তান ইয়াশাত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হারিয়ে আহাজারি করছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। সন্তানের মরদেহ বাড়িতে আনার পর আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে কোটবাড়ির গন্ধামতি এলাকার নূরজাহান ভিলার পরিবেশ।

অপ্রতিমের মরদেহ যখন শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল, তখন টানা দুই দিনের নির্ঘুম, ক্লান্ত মা শেষবারের মতো সন্তানের মুখ ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বিদায় জানান। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
সকাল ১০টায় মায়ের কর্মস্থল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল ১১টায় বাড়ির পাশে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত শুক্রবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয় সে। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি।

শুক্রবার রাত ১২টার দিকে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে তার সন্ধানে কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, শুরুতে অপ্রতিমের মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শনিবার সকালে আরও পুলিশ সদস্য তার সন্ধানে মাঠে নামেন। পরে দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, পুলিশের ভূমিকার চেয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা বেশি ছিল।

অপ্রতিমের প্রতিবেশী আবু সাঈদ বলেন, শুক্রবার রাত ১২টার পর জিডি করা হলেও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপ্রতিমের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয় সকালে।

এদিকে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের পর লালমাই পাহাড় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্য একজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

আজ দুপুর ২টায় সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য জানান।

গ্রেপ্তার চারজন হলেন– সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), সালমানপুর এলাকার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার কামরুল হাসান (১৫) এবং সদর দক্ষিণের এলাহিপুর এলাকার মো. সিয়াম।

পুলিশ সুপার বলেন, জিডি করার পরপরই তদন্ত শুরু করে পুলিশ। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তুহিন অপ্রতিমকে একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। মূলত অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটির প্রতি তুহিনের নজর ছিল।

পুলিশ সুপারের ভাষ্য, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ফাহাদ ও তার বন্ধু কামরুল জড়িত। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ফাহাদের দেওয়া তথ্যে কামরুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজনের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যজনের ভূমিকা অধিকতর যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশের দাবি, গত শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিম ঘাতকদের সঙ্গে দেখা করে। পরে বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়।