ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলিতে পড়ে আছে এক কিশোরীর নিথর দেহ। পরনে ম্যাক্সি, হাতে আঘাতের চিহ্ন।
পাশে নেই কোনো স্বজন, নেই পরিচয়পত্র বা চিকিৎসার কাগজপত্রও। কিছুক্ষণ আগে দুই ব্যক্তি তাকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে এনে ‘টিকিট কাটতে’ যাওয়ার কথা বলে সরে যান।
এরপর আর ফেরেননি তারা। ফলে পরিচয়হীন এই কিশোরীর মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য।
বুধবার (১২ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলিতে নিথর পড়ে আছে মেয়েটি। আশপাশে রোগী ও স্বজনদের ব্যস্ততা।কেউ ছুটছেন চিকিৎসকের কাছে, কেউ ওষুধের জন্য, কেউ আবার কৌতূহলী হয়ে তাকাচ্ছেন ট্রলিটির দিকে। কিন্তু যে মেয়েটিকে ঘিরে এত মানুষের ভিড়, তার পরিচয় জানেন না কেউ। জীবিত অবস্থায় শেষ মুহূর্তে তার পাশে কারা ছিলেন, সেটিও এখন রহস্য।
ঘটনাস্থলে কথা হয় ট্রলিম্যান রউফের সঙ্গে। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “ওই দুজন খুব তাড়াহুড়ো করে এসে বলল, একটা ট্রলি দিতে। মেয়েটাকে ট্রলিতে উঠিয়ে দ্রুত ইমার্জেন্সির সামনে নিয়ে আসি। এরপর পেছনে তাকিয়ে দেখি, তারা নেই।”
তিনি জানান, মেয়েটিকে হাসপাতালে আনার সময়ও ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে ছিল এক ধরনের তাড়াহুড়া। তারা যেন কোনোভাবে মেয়েটিকে জরুরি বিভাগের সামনে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী রাসেলও পুরো ঘটনাটি কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেন, “দুজন মধ্যবয়সী লোক ট্রলির খোঁজ করছিলেন। এদের মধ্যে একজন পাঞ্জাবি পরিহিত। আমি ট্রলিম্যানকে দেখিয়ে দিই। পরে ট্রলিটা ঠেলে উপরে উঠিয়ে দিতেও সহযোগিতা করি। তাদের টিকিট কাউন্টার দেখিয়ে দিয়েছিলাম। এরপর পেছনে তাকিয়ে দেখি, তারা নেই। ভেবেছিলাম কাউন্টারে গেছে। কিন্তু সময় গড়ালেও তারা আর ফিরে আসেনি।”
রাসেলের কাছে বিষয়টি প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা স্বজনদের অনেকেই টিকিট, কাগজপত্র কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কাজ করতে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করেন। কিন্তু সময় পার হওয়ার পরও যখন ওই দুই ব্যক্তির কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না, তখনই বিষয়টি সন্দেহের জন্ম দেয়।
হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আবদুল কাদের ও হানিফ বলেন, “দুজন লোক তড়িঘড়ি করে মেয়েটিকে ট্রলিতে করে ইমার্জেন্সির সামনে নিয়ে আসে। এরপর টিকিট কাটার কথা বলে চলে যায়। পরে আর তাদের দেখা যায়নি।”
মেয়েটির সঙ্গে কোনো স্বজন না থাকায় তার পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কে এই কিশোরী, কোথা থেকে তাকে আনা হয়েছে, তার সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তি কারা- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর তখন কারও কাছে ছিল না।
হাতে আঘাতের চিহ্ন, মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ
ঘটনাটি শুধু একজন পরিচয়হীন কিশোরীর মৃতদেহ হাসপাতালে পড়ে থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকায় মৃত্যুর কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফারুক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, “মেয়েটি টিনেজার। তার হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, কোথা থেকে তাকে আনা হয়েছে- এসব জানার চেষ্টা চলছে।”
তিনি বলেন, “এত অল্প বয়সী একটি মেয়ের আত্মহত্যা হয়েছে কি না, সেটাও এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে। তবে যারা মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, তারা যদি সত্যিই স্বজন হয়, তাহলে মেয়েটিকে রেখে এভাবে চলে যাওয়াটা সন্দেহজনক।”
পুলিশের এই বক্তব্যে ঘটনাটিকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। কারণ মেয়েটি অসুস্থ হয়ে মারা গেছে, নাকি হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল- তাৎক্ষণিকভাবে সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্ন কীভাবে হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরুরি বিভাগের সামনে পড়ে থাকা মেয়েটির নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে যেন বারবার একই প্রশ্ন উঠছিল- কে এই মেয়েটি?
তার কি কোনো পরিবার নেই? তার কি মা-বাবা নেই? নাকি কোনো এক পরিবারের সদস্য হয়েও শেষ মুহূর্তে সে হয়ে গেল পরিচয়হীন?
যে দুই ব্যক্তি তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, তারা কি সত্যিই তার স্বজন? তারা কি শ্বশুরবাড়ির লোকজন? নাকি মেয়েটির সঙ্গে তাদের অন্য কোনো সম্পর্ক রয়েছে? যদি তারা স্বজনই হন, তাহলে মৃত্যুর পর মেয়েটিকে একা ফেলে যাওয়ার কারণ কী?
হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনদের কেউ কেউ মেয়েটির পরিচয় জানার চেষ্টা করেন। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, কেউ হাসপাতালের কর্মীদের কাছে জানতে চাইছিলেন কী হয়েছে। কিন্তু কেউই বলতে পারছিলেন না, মেয়েটির আপনজন কারা।
ব্যস্ত হাসপাতালের এই জায়গাটিতে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ আসে। কারও কান্না, কারও স্বজনকে বাঁচানোর আকুতি- সব মিলিয়ে জরুরি বিভাগ যেন জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর প্রতিদিনের লড়াইয়ের সাক্ষী। সেই জায়গাতেই এক কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকা দৃশ্যটি আলাদা করে নাড়া দিয়েছে অনেককেই।
হাসপাতাল পুলিশ বলছে, মেয়েটির পরিচয় শনাক্ত করার পাশাপাশি কোথা থেকে তাকে আনা হয়েছে এবং কারা তাকে হাসপাতালে রেখে গেছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। এসব তথ্য পাওয়া গেলে হয়তো জানা যাবে তার জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল।












