আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি সোহেল রানাকে দেখিয়ে রাজধানীর মিরপুরে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘হত্যা ও করছে, ধর্ষণও করছে।’
রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় এভাবেই বলেন তিনি।
সাক্ষ্যগ্রহণে রামিসার মা পারভিন বেগম বলেন, ‘আনুমানিক ১০টা, আমি তখন রান্না করছিলাম। দুই মেয়ের পার্শ্ববর্তী চাচার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছে কি না আমি বুঝতে পারিনি। এরপর রান্নাঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। আমি মনে করি, পাশের ফ্ল্যাটে (আসামিদের) কোনো বাচ্চা হয়তো চিৎকার দিচ্ছে। এদিকে, আমি অপেক্ষা করছি রামিসা এখনো আসছে না কেন। কখন আসবে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একাই বাসায় ফিরে। আমি ওকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, রামিসা আমার সঙ্গে যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশপাশ খোঁজ করেও পাচ্ছিলাম না রামিসাকে। সবাইকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু সবাই বলে, দেখিনি। নিচে একটা অফিসের কাজ চলছিল। সেখানে ঢুকে দেখি, মেয়ে আছে কি না। এরপর দোতলায় খুঁজি। সেখানেও নেই। আমার পাশের ফ্ল্যাটে দরজায় কড়া নাড়ি। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। হঠাৎ চোখ পড়ে দরজার সামনে মেয়ের একটা স্যান্ডেল। তখন আমার ভাবনায় আসে, মেয়েকে কি এখানে আটকে রেখছে। আমার শব্দ শুনে পাঁচতলা থেকে আসমা নামের এক নারী নেমে আসেন। ধীরে ধীরে আশপাশের লোকজনও চলে আসে। তাদেরকে জানাই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার স্বামীকেও ফোন দেই। অনেকে চেয়ার নিয়ে ওপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না।’
পারভিন বেগম বলেন, ‘পরে দরজা ভেঙে সবাই ভেতরে ঢুকি। তখন রাজু নামের একটি ছেলে ভিডিও করছিল। স্বপ্না হাটাহাটি করছিল। বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে বাথরুমে অসংখ্য রক্ত দেখতেই পাই। এরপর রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখি। পুলিশ এসে রামিসার জামা ও মরদেহ উদ্ধার করে।’
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থাকা স্বপ্নাকে দেখিয়ে রামিসার মা বলেন, ‘তারে আমি অনেকবার বলেছি, বোন দরজাটা খুইলা দে, খুইলা দে। কিন্তু ও খোলে নাই। আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। উপস্থিত লোকজনই ওকে প্রশ্ন করেছে। পরে আমি তাদের কাছ থেকে শুনতে পাই, সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালাইছে।’
এরপর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সোহেল রানাকে দেখিয়ে পারভীন বেগম বলেন, ‘হত্যা ও করছে, ধর্ষণও করছে।’
এদিকে পারভীন বেগম ছাড়াও শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও বোন রাইসা আক্তারসহ ১০ জন সাক্ষী।
এদিন সকাল পৌনে ৯টায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। পরে তাদের আদালতে তোলা হয়।
এর আগে সোমবার দুই আসামির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা ও মরদেহ গোপনের অভিযোগে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। একই দিন বিকেলে মামলার বাদীসহ ১৭ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।
গত ১৯ মে সকালে পাশের ফ্ল্যাটে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের ভেতরে থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০ মে সোহেল আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।












