নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে নিখোঁজের দুই বছর পর পুকুর খুঁড়ে মা ও তার শিশুপুত্রের কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ ঘটনায় নিহত নারীর দুই সৎ ছেলে ও এক নাতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে উপজেলার জয়াগ ইউনিয়নের জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুরে ভেকু মেশিন দিয়ে খননকাজ চালিয়ে কঙ্কাল দুটি উদ্ধার করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
নিহতরা হলেন: কমলা বেগম (৩২) ও তার ছেলে মো. নোমান (৯)। কমলা একই এলাকার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী।
জানা গেছে, ২০১২ সালের কোনো এক সময়, জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে বিধবা কমলা খাতুন নতুন করে সংসার জীবনে পা রাখেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। জন্ম নেয় তাদের পুত্র সন্তান নোমান। আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল পাঁচ ছেলে, যাদের মধ্যে তিনজন এখন জীবিত। সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে পরিবারটি। সৎ সন্তান, তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং নিজের সন্তানকে নিয়ে কমলা খাতুন ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হলে সংসারের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরও কমলা খাতুন তার একমাত্র ছেলে নোমান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। বাহ্যিকভাবে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ, ভিকটিমের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে তাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এ খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম। তিনি এসে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে তার বোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারাও কমলা খাতুনকে খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান। তারা রহিমা বেগমকে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এ বিষয়ে তারা থানায় জিডিও করা হয়েছে বলে তথ্য দেন। কিন্তু রহিমা বেগম তাদের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। তিনি নিজেই বাদী হয়ে ১৪ মার্চ, ২০২৪ তারিখে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। সেখানে সাগর (৩৫), রাজু (৩০), শ্যামলী (৪৫) ও কাজল (৩৮) নামীয় ০৪ জনকে সন্দেহভাজন বিবাদী করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিজ্ঞ আদালত প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), নোয়াখালীকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কমলা বেগম ও তার শিশুপুত্র নোমানকে হত্যা করা হয়। পরে শুকনো মৌসুমের সুযোগ নিয়ে মরদেহ দুটি বিবস্ত্র অবস্থায় পুকুরে মাটিচাপা দিয়ে গুম করা হয়।
সিআইডি পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দীর্ঘ তদন্তের একপর্যায়ে সিআইডি নিহতের দুই সৎ ছেলে রাজু ও সাগর এবং নাতি টিপুকে গ্রেফতার করে। তাদের দেয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে রোববার পুকুরে খনন চালিয়ে মা-ছেলের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর প্রথমে আদালতে একটি মামলা হয়। পরে সোনাইমুড়ী থানায় একটি জিআর মামলা করা হয়। ওই মামলার তদন্তে জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কঙ্কাল উদ্ধারের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসী ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করে স্লোগান দেন।












