কুমিল্লাবৃহস্পতিবার, ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয় পেলেও ক্রিকেট যুদ্ধে হেরে যাওয়ার কথা স্বীকার

প্রতিবেদক
Cumilla Press
জানুয়ারি ২৪, ২০২৬ ১:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা আরও দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া যেত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুল হক।

রাজনৈতিক স্বার্থে মোস্তাফিজকে কলকাতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন আশরাফুল হক।

ক্রিকবাজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে হয়তো রাজনৈতিকভাবে একটি অবস্থান নেয়া হয়েছে। কিন্তু ক্রিকেটের দিক থেকে বাংলাদেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তার ভাষায়, ‘আমরা হয়তো একটি রাজনৈতিক লড়াই জিতেছি, কিন্তু ক্রিকেটের যুদ্ধে হেরে গেছি।’

আলোচনার টেবিলে শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেয়াকেই বিসিবির সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল বলে মনে করেন সৈয়দ আশরাফুল হক। তার মতে, ‘আমাদের বলা উচিত ছিল— চলুন কথা বলি। আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান বের করা যেত। কিন্তু আমরা শুরুতেই বলেছি, শ্রীলঙ্কায় না হলে খেলব না। এতে আমরা নিজেরাই নিজেদের কোণঠাসা করেছি।’

তিনি আরও বলেন, এই অবস্থানের ফলে ভারতের চরমপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কৌশলের ফাঁদে বাংলাদেশ পা দিয়েছে।

বর্তমান সংকটকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ উল্লেখ করে আশরাফুল হক বলেন, এ ক্ষেত্রে বোর্ড সরকারের সিদ্ধান্তের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক রীতিতে নিরাপত্তা ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার খেলোয়াড়দের হাতে থাকার কথা।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ড আইসিসির নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরে বলত—যারা নিরাপদ মনে করে, তারা যাবে। যারা করবে না, তারা যাবেন না। কোনো শাস্তি হবে না। এখানে সেই সুযোগই খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়নি।’

সরকারকে বোঝাতে বিসিবি ব্যর্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, যেহেতু বর্তমান সরকার একটি অস্থায়ী সময় পার করছে, তাই বোর্ডের উচিত ছিল আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা।

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না বলে মনে করেন আশরাফুল হক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে এখন অসাধারণ এক জনসংযোগ কার্যক্রম চালাতে হবে ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে। আমরা দেখেছি, আইসিসির বৈঠকে মাত্র একটি ভোট পেয়েছি—এটাই আমাদের অবস্থান বোঝায়।’

বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশ আদালতে নেয়ার সম্ভাবনা নিয়েও খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন  না তিনি। স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমরা সেখানে জিতব না।’

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তারা বলবে, আগের সব বিশ্বকাপই আয়োজক দেশের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মালিক আইসিসি, এবং তারা এ বিষয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করে। সেই মূল্যায়নের পরই আইসিসি সদস্য দেশগুলোর কাছে তাদের সুপারিশ জানায়। আইসিসির সুপারিশ একেবারেই স্পষ্ট—এই মুহূর্তে ভারতে কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই। আমাদের একমাত্র যুক্তি হলো, নিরাপত্তাজনিত কারণে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে খেলতে দেওয়া হয়নি। তাহলে কীভাবে পুরো জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? এটিই আমাদের একমাত্র যুক্তি। কিন্তু তাদের পাল্টা যুক্তি হবে—আইপিএল একটি স্থানীয় বা ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্ট কিংবা ভারত সফরকারী কোনো দলের জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার সঙ্গে ঘরোয়া টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেখানে নিরাপত্তার স্তর থাকে—এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত।’

রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে না রাখার পেছনে মূল কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচন। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি কর্তৃপক্ষ।’

এদিকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে আইসিসি চাইলে বিসিবির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও মত তার। তিনি বলেন, ‘আইসিসির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে এবং তা মূল্যায়নের দায়িত্ব আইসিসিরই।’

এ ছাড়া বাংলাদেশের বিপুল দর্শকসংখ্যা বিশ্বকাপ সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দর্শকসংখ্যা কমে গেলে সম্প্রচারস্বত্ব সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগও আইসিসির থাকতে পারে।’

ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, ‘এটা ঠিক না হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মৃত্যু ঘটবে।’