বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। বহু শীর্ষ নেতা তাদের রাজনৈতিক জীবনের চূড়ায় পৌঁছে জড়িয়েছেন নানা অনৈতিক সম্পর্কে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ফাঁসের পাশাপাশি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যৌন হেনস্তার ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। এসব ঘটনা কেবল নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনকেই ধ্বংস করেনি, বরং কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করা কয়েকজন আলোচিত নেতার কেলেঙ্কারি নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত কেলেঙ্কারির একটি ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হোয়াইট হাউজের সাবেক ইন্টার্ন মনিকা লিউইনস্কির সাথে সম্পর্কে জড়ান। শুরুতে ক্লিনটন বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন। তবে পরে অকাট্য প্রমাণের মুখে তিনি এই অনৈতিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হন। এ ঘটনা মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র ঝড় তোলে এবং ক্লিনটন প্রায় অভিশংসনের মুখে পড়েন। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমগুলোতে মাসের পর মাস এই খবর প্রধান শিরোনাম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল।
ইতালি তথা ইউরোপের রাজনীতিতে সবচেয়ে রঙিন ও বিতর্কিত চরিত্র ছিলেন সিলভিও বারলুসকোনি। ইতালির এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত বাসভবনে জমকালো ও আপত্তিকর পার্টির আয়োজন করতেন । রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এই পার্টিগুলো ‘বুঙ্গা বুঙ্গা’ নামে পরিচিতি পায়। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ছিল এক অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর সঙ্গ অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। যদিও চূড়ান্ত রায়ে তিনি এই অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছিলেন, কিন্তু এই কেলেঙ্কারির কারণে বারলুসকোনিকে দীর্ঘ সময় আদালতের বারান্দায় কাটাতে হয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ড ইতালির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ব্যক্তিগত জীবন ছিল রহস্যে ঘেরা। জনপ্রিয় এই নেতার সুদর্শন চেহারা এবং ব্যক্তিত্বের কারণে অনেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট হতেন। হলিউডের তৎকালীন কিংবদন্তি ও আবেদনময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর সঙ্গে কেনেডির গোপন সম্পর্ক ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। মনরোর আকস্মিক মৃত্যু এবং কেনেডি পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়ে আজও বহু রহস্য রয়ে গেছে। কেনেডির এই নারীপ্রীতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও তৎকালীন সময়ে বড় উদ্বেগের কারণ ছিল।
ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হলো যুক্তরাজ্যের ‘প্রফিউমো অ্যাফেয়ার’। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ যুদ্ধমন্ত্রী জন প্রফিউমো ক্রিস্টিন কিলার নামে এক তরুণী মডেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। সমস্যাটি কেবল নৈতিকতার ছিল না, বরং তা রূপ নেয় জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে। কারণ কিলার একই সময়ে এক সোভিয়েত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধের ওই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের শীর্ষ গোপন তথ্য পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়। পার্লামেন্টে মিথ্যা বলার পর প্রফিউমো পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং পরে পুরো ব্রিটিশ সরকারের পতন ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনও নারীঘটিত বিতর্কের বাইরে নয়। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়। ড্যানিয়েলসের দাবি ছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে তার অতীত সম্পর্ক ছিল এবং তা গোপন রাখতে টাকা দেওয়া হয়। এই অর্থ লেনদেনের আইনি জটিলতা এবং ব্যবসায়িক নথিপত্র জালিয়াতির অভিযোগে ট্রাম্পকে পরবর্তী সময়ে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। এটি ছিল আধুনিক মার্কিন রাজনীতিতে কোনো প্রেসিডেন্টের ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা।পড়ুন
ফ্রান্সের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান ডমিনিক স্ট্রস-কান। তিনি যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার জীবন উল্টে যায়। নিউইয়র্কের বিলাসবহুল হোটেলে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী কর্মীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। এই ঘটনার পর তিনি আইএমএফ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যদিও ফৌজদারি অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত আদালতে টেকেনি এবং মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে খারিজ করা হয়েছিল, কিন্তু এর জেরে তার উজ্জ্বল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে।
ইসরায়েলের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোশে কাৎসাভের ঘটনাটি ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। ২০১০ সালে ইসরায়েলের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে একাধিক নারী সহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। রাষ্ট্রপ্রধানের মতো সর্বোচ্চ পদে থেকে এমন জঘন্য অপরাধ বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। বিচারে তার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা।
নিউইয়র্কের সাবেক গভর্নর ইলিয়ট স্পিৎজার দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক তদন্তে দেখা যায়, তিনি নিজেই একটি আন্তর্জাতিক এসকর্ট সার্ভিসের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান এবং নৈতিকতার দাবি ধূলিসাৎ করে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা এবং লালসা প্রায়শই একসঙ্গে হাঁটে। বিশ্বের পরাক্রমশালী এই নেতারা সাধারণ মানুষের চোখে আইকন হলেও ব্যক্তিগত জীবনে স্খলন এড়াতে পারেননি। আইনের শাসন এবং জনরোষের মুখে অনেককেই শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের এই নৈতিক পতন বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।












