মরুভূমির সোনালী ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো নারী কর্মীদের অনেকের জন্যই প্রবাস জীবন এখন এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার নাম। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঘর ছেড়ে যাওয়া এই নারীদের কেউ কেউ ফিরছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে, আবার কারও কারও স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফিরছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসে নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন, অধিকার লঙ্ঘন এবং কূটনৈতিক নানা ইস্যুতে দেশের জনশক্তি রপ্তানি ও অভিবাসন খাত এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে সৌদিতে নারী কর্মীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন এবং অন্যদিকে কোনো পূর্বসংকেত বা তথ্য না জানিয়ে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
বেসরকারি ও সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস বা ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র নয় মাসে প্রবাসের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মীকে, যা মোট প্রত্যাবাসনের প্রায় ৫৮.৬২ শতাংশ। এ ছাড়া জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের বিভিন্ন সময়ে এই সংখ্যা ক্রমান্বয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে শুধু সেপ্টেম্বরেই সৌদি আরব থেকে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন নারী কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া, নিয়মিত বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের কঠোর চাপ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব নারী কর্মী শূন্যহাতে ও চরম ট্রমা নিয়ে দেশে ফিরছেন। সাভারের শিলা বেগম এবং দোহারের জাহানারা বেগমের মতো ভুক্তভোগীদের বিবরণে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব তথ্য। শিলা বেগম জানান, যে গৃহকর্তার বাসায় কাজ করতেন, সেখানে তাঁকে দিনরাত অমানবিক পরিশ্রম করানো হতো, ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না এবং রান্নাঘরে ঘুমাতে বাধ্য করা হতো। বাসা থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না, যা একপ্রকার জেলখানা জীবনের সমতুল্য। একইভাবে জাহানারা বেগম জানান, সংসারে সচ্ছলতা আনতে সব কিছু বিক্রি করে সৌদি আরব গেলেও সেখানে জালিম মালিকের কুপ্রস্তাব ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত অবিরাম কাজ করতে হয়েছে।
নারী শ্রমিকদের এই শোচনীয় অবস্থার পাশাপাশি সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কায় মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিক—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরণের আলোড়ন তুলেছে। ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন করে বাংলাদেশকে কোনো কিছু না জানিয়ে এই ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ওপর বাড়তে থাকা চাপের মুখে পড়ে গত রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলী) নজরুল ইসলাম। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সৌদি রাষ্ট্রদূতের হাতে পূর্বে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কপি হস্তান্তর করে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈদেশিক শ্রমবাজার বহুমুখী করার কথা বলা হলেও বাংলাদেশ এখনো মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশেষ করে সৌদি আরবকেন্দ্রিক শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। যেখানে পাশের দেশগুলো দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে, বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে প্রধানত অদক্ষ কর্মী। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেলেও তার দুই-تریয়াংশ অর্থাৎ ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। আর চলতি বছরেও বহির্গমন ছাড়পত্র নেওয়া ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জনের মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদাগামী।
এই সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণের বিষয়ে অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জোরালো মতামত দিয়ে বলেন, আমাদের শ্রমবাজার খাতকে দ্রুত সম্প্রসারিত ও বহুমুখী করতে হবে। জর্ডানে তৈরি পোশাক কারখানায় নারীরা কাজ করলেও সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে তারা সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার শিকার হন এবং তাদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। তাই গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নারীদের জন্য কারিগরি ও বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যেন কনস্ট্রাকশন বা অন্যান্য কারিগরি খাতে কাজ করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে গৃহবন্দি রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করে ডরমিটরি বা হোস্টেলভিত্তিক আবাসনের ব্যবস্থা করার ওপরও জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং প্রবাসে নারী কর্মীদের জীবন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।












