কুমিল্লামঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ

প্রতিবেদক
Cumilla Press
অক্টোবর ১২, ২০২৬ ২:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার পথে ১৫ বছরের জান্নাতুল তাজমিনের নিরাপত্তা নিয়ে কারও উদ্বেগ ছিল না? বাস কাউন্টারের কর্মী বুঝেছিলেন, একা মেয়েটির রাতে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু যাত্রার সময়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তার নিরাপত্তা কিংবা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাস থেকে নেমে সিএনজিতে ওঠা তাজমিনের মরদেহ মিলল ধানখেতে। পুলিশ বলছে, হত্যাকারী একজন, সিএনজিচালক সুমন মিয়া। তবে তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার কারণ, কক্সবাজার যাওয়া, ফেরার যাত্রা এবং শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।

‘ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বুঝা উচিত ছিল, আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছাবে। ওরও (তাজমিন) বুঝা উচিত ছিল। আমি বলতে চাইছিলাম ওদের। কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে, তাই বলা হয়নি।’ কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজার আইকনিক বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ।

জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার বাসের টিকিট কাটতে যায় সে ও তার প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কাটা হয়। বাস ছাড়ে দুপুর একটার দিকে। একা যাত্রা করবে বলে তাজমিনের জন্য সিঙ্গেল সিটের টিকিট কাটেন রাজু।

তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ

রাজুর দাবি, তাজমিন যাতে নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছাতে পারে, সে জন্য তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাজমিনের শেষ যাত্রার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

আটক রাজুর ভাষ্য, একটি হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রাজুকে সে জানিয়েছিল, ওই নারী তার সৎমা এবং তার নিজের মা মারা গেছেন। এরপর সে এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকার সময় থেকেই রাজুর সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। পরে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন।

তবে পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছিল। এ সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকলেও সে কোথায়, কার কাছে ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পান বলে জানা গেছে।

রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে একাধিকবার ফোন করে অবস্থান জানতে চান এবং বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করেন। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তাজমিনকে বলতে শুনেছিলেন, সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। এরপরই মঙ্গলবার রাতে দুজন আইকনিক এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের টিকিট কাটে।

কিন্তু তাজমিনের বাড়ি ফেরার সেই যাত্রা আর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল বলে সাংবাদিকদের জানান তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন মা। কিন্তু বান্ধবীর নাম কিংবা তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানান তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন, চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। তবু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের মা যে বান্ধবীর কথা বলেছেন, তিনি তাজমিনের চেয়ে বয়সে বড়। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তবে তিনি কুমিল্লায় থাকেন। হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন।

শিক্ষকের ভাষ্য, বাড়িতে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বেরিয়ে যেত।

তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্ব ও রাজুর সঙ্গে সম্পর্কের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বাড়ি ছাড়ার পর কয়েক দিন ধরে তার অবস্থান, চলাফেরা ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে হত্যা করেছেন একজনই, সিএনজিচালক সুমন মিয়া (৩৫)। শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলছে।

কক্সবাজারে অবস্থানকালে রাজুর ভূমিকা এবং তাজমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তদন্তে এখনো তার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে রাজুকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে পুলিশ। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে গেছেন।

পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাস থেকে নেমে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।