কুমিল্লাসোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কম্বোডিয়ায় বসে অনলাইন প্রতারণা, বাংলাদেশে ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ

প্রতিবেদক
Cumilla Press
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ ৪:৪৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কম্বোডিয়ায় বসে বাংলাদেশিদের টার্গেট করে অনলাইনে বিনিয়োগের নামে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

চক্রটির বাংলাদেশি তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। তাদের মধ্যে একজন কম্বোডিয়ায় অবস্থান করে চক্রটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পিবিআই বলছে, চক্রটি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলতো। এরপর টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কথাবার্তা বলতো। একপর্যায়ে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করে ফোন, বার্তা ও ভিডিও কলের মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হতো। বিনিয়োগের পর বিভিন্ন অজুহাতে আরও টাকা নেওয়া হলেও ভুক্তভোগীদের কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হতো না।

এমন প্রতারণার শিকার হয়ে রাজধানীর দারুস সালামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা খুইয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার তিনজন হলেন— মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ (২৭), আবুল হাসান ওরফে নাঈম (২৪) এবং সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা (২৪)। খুলনার হরিণটানা, খালিশপুর ও আড়ংঘাটা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

তিনি বলেন, মামলাটির তদন্তকালে গ্রেপ্তার তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির আরও কয়েকজন সদস্যের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ভুক্তভোগী এন সায়েম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে টেলিগ্রামে একটি নম্বরের মাধ্যমে পরিচয় হয় প্রতারক চক্রের সদস্যদের। তারা নিজেদের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর বিভিন্ন দেশের বিমানের টিকিট কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির কথা বলে তাকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করেন।

প্রথমে টিকিটের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রেটিং দেওয়ার কাজ দেখিয়ে তাকে বিনিয়োগে রাজি করানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি টাকা দেওয়া শুরু করেন। শুরুতে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫১ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে পাঠান। তাকে বলা হয়, এই বিনিয়োগ থেকে লাভসহ ১১ লাখ ৬৯ হাজার ২৫০ টাকা পাবেন।

কিছুদিন পর টাকা উত্তোলনের আবেদন করলে প্রতারকরা নতুন শর্ত জুড়ে দেয়। জানানো হয়, দুই লাখ টাকার বেশি উত্তোলনের জন্য আগে জমা দেওয়া অর্থের ৫০ শতাংশ নিরাপত্তা জামানত হিসেবে আবার জমা দিতে হবে। সেই অনুযায়ী ভুক্তভোগী আরও ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬২৫ টাকা দেন।

এরপরও টাকা ফেরত না দিয়ে নতুন অজুহাত দেওয়া হয়। এবার বলা হয়, লাভসহ পুরো টাকা তুলতে হলে তার নামে একটি ‘ভিআইপি চ্যানেল’ খুলতে হবে। এর জন্য আরও আট লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী সেই অর্থও দেন।

পরে তাকে জানানো হয়, তার অ্যাকাউন্টে লাভসহ ২৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮৭৫ টাকা জমা হবে। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার বলা হয়, টাকার পরিমাণ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ‘ক্লিয়ারেন্স’ প্রয়োজন। এর জন্য আরও ১২ লাখ টাকা দিতে হবে। পরে দর-কষাকষির পর নয় লাখ টাকায় কাজটি করে দেওয়ার কথা বলা হয়। তিন দিনের মধ্যে টাকা না দিলে আগের সব বিনিয়োগ ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাবে বলেও তাকে ভয় দেখানো হয়।

এরপর ভুক্তভোগী আরও সাত লাখ এবং পরে পাঁচ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে পাঠান। সব মিলিয়ে তিনি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা দিয়ে প্রতারিত হন।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মান্নান বলেন, প্রথমে এ ঘটনায় সিআর মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তদন্তে বিকাশ ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। সন্দেহভাজনদের অবস্থানও শনাক্ত করা হয়। এর ভিত্তিতে দারুস সালাম থানায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়। পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি স্বউদ্যোগে তদন্তের জন্য নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)।

তদন্তে উঠে আসে, চক্রটির সঙ্গে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মেহেদী হাসান সোহাগের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার সঙ্গে সুমাইয়া খাতুনের পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে সুমাইয়ার নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। সুমাইয়ার নামে থাকা একটি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ লাখ ১৪ হাজার ৫৫০ টাকা জমা হয়। পরে সেই অর্থ মেহেদী হাসানের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।

এ ছাড়া, একই অ্যাকাউন্টে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত আরও ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই অর্থের একটি অংশ মেহেদীর নির্দেশিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আবুল হাসান নাঈমের হেফাজত থেকে সুমাইয়া খাতুনের নামে থাকা আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের তিনটি এটিএম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে মেহেদী হাসান চক্রটির প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় এ ধরনের প্রতারক চক্রের একাধিক দল রয়েছে। তারা আলাদা আলাদা ডেস্কে কাজ করে এবং প্রতিটি দলে বাংলাদেশি এজেন্টও থাকে।

চক্রটি প্রথমে সুন্দরী নারীদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলতো। এরপর টার্গেট ব্যক্তিদের কাছে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানো হতো। বন্ধুত্ব হওয়ার পর নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কয়েক দিন কথাবার্তা চালিয়ে ওই ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করা হতো।

হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পাওয়ার পর চক্রের নারী সদস্যরা ফোন, বার্তা ও ভিডিও কলের মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতেন। এরপর অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। বিনিয়োগের পর একের পর এক নতুন শর্ত ও ফি আরোপ করে আরও টাকা আদায় করা ছিল চক্রটির কৌশল।

মামলার তদন্তে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত টেলিগ্রাম গ্রুপের তথ্য, বিভিন্ন ভুয়া সদস্যের তথ্য, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, কথোপকথনের তথ্য, ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। কম্বোডিয়ায় অবস্থানকারী মেহেদী হাসানের পাসপোর্টের কপিও পেয়েছে পিবিআই।

পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের জবানবন্দিতে চক্রটির সঙ্গে আরও একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর) জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থের বিষয়ে আরও তথ্য এবং ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।