কুমিল্লাবুধবার, ১৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের পরদিন ডিসি প্রত্যাহার, ইউএনও বদলি

প্রতিবেদক
Cumilla Press
আগস্ট ১৯, ২০২৬ ৬:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের পরদিনই নাটোরের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এই বদলির আদেশ দেয়া হয়।

এই আকস্মিক বদলিকে কেন্দ্র করে নাটোরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কারণেই এই কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী কমিশনার প্রীতিলতা বর্মণ স্বাক্ষরিত অপর এক আদেশে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়।

গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। গত ১৭ আগস্ট এ ঘটনায় লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী বাদী হয়ে নিজ নিজ থানায় দুটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহার দুটিতে সরকারদলীয় ২৫ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

বিভিন্ন মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি জেলাজুড়ে জানাজানি হয় এবং ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাটোরের ডিসি আসমা শাহীনের প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনও বরকত উল্লাহর বদলির আদেশ আসে।

এ ঘটনায় জেলার সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, হামলাকারী ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় যদি কর্মকর্তাদেরই বদলির শিকার হতে হয়, তবে মাঠ প্রশাসনে সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তাদের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

লালপুরে দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত ১৮ জন হলেন―গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজ রঞ্জু, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. হারুন অর রশিদ পাপ্পু, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান জুলহাস, উপজেলা বিএনপির সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ উদ্দিন, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. আব্দুল বারী কাজল, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. হযরত আলী, দুয়ারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. শাহিনুর রহমান, আরবাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হযরত আলী, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইলিয়াস হোসেন, এবি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবেদ আলী, লালপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম রবি, পৌর বিএনপির মোহাম্মদ আলী আজম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রায়হান কবীর সুইট, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান এবং পৌর যুবদলের মো. সুমন। এছাড়া অজ্ঞাত আরও ৪০-৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাগাতিপাড়ায় দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত সাতজন হলেন―উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সাব্বির হোসেন মুন্না। দায়েরকৃত এজাহারে অজ্ঞাত আরও ১০০-১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

নাটোর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ থাকলে মামলা করতে কোনো আপত্তি নেই। তবে ঢালাওভাবে বিএনপির উপজেলা ও পৌর কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মামলায় আসামিদের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা না উল্লেখ করে দলীয় পদ-পদবি উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট বা সরকারি কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় যারা প্রকৃতভাবে জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে বিএনপি। তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি বা দলীয় নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, নাটোর জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ শিশির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা ওবায়দুল্লাহ মিম তাদের ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লালপুর-বাগাতিপাড়ায় ইউএনও অফিস ভাঙচুরের অভিযোগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার পরই নাটোর জেলার ডিসি ও ইউএনও প্রত্যাহার। যে দেশে পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করার জন্য প্রত্যাহারের শিকার হন, সে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নাটোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণেই ইউএনও-ডিসিকে বদলি করা হয়েছে। এমনটি হয়ে থাকলে তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার ও প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং দেশের জন্যও কল্যাণকর নয়। এ ধরনের ঘটনা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেবে এবং দুর্নীতি ও অনিয়মকে উৎসাহিত করবে। মানুষের কাছে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সরকারের যে অঙ্গীকার, এ ঘটনা তার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।