সাড়ে ৬ হাজার মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে দৈনিক লেনদেন পাঁচ কোটি।
গাজীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনার বিপুল পরিমাণ সিমসহ একটি চক্রের মূলহোতাসহ ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবি বলছে, এই চক্রের মূলহোতা অবৈধ এই জুয়া পরিচালনার মাধ্যমে দেশে চক্রের মূল হোতা আরিফুল দৈনিক ৫ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করতো। আর দেশের বাইরে থেকে এই চক্রটিকে নিয়ন্ত্রণে করতো চাইনিজ নাগরিক নাতান।
ডিবির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইট সমূহে এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দৈনিক ৭০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। যা ডলার হিসেবে দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টুরোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘অনলাইন জুয়া বিরোধী অভিযানে ৬,৫০০ টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিম কার্ড জব্দসহ আসামি গ্রেফতার’ সংক্রান্ত এক সংবাদ সন্মেলনে এসব জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো.শফিকুল ইসলাম।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।
মো.শফিকুল ইসলাম বলেন, ডিবি কতৃক গাজিপুর ও কুমিল্লায় অভিযান পরিচালনা করে অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযান কালে তাদের কাছ থেকে ৬৬০০ টি এমএফএস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ১ টি ল্যপটপ, তাদের কাছ থেকে ৭০ এর অধিক মোবাইল ডিভাইস ও ১ টি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়।
ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশন কর্তৃক সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে জুয়ার বেশ কিছু ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপলিকেশন সনাক্ত করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনলাইন জুয়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাইটগুলিতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্টের ব্যবহার করা হয়। জুয়ার সাইট ও মোবাইল অ্যাপস থেকে প্রাপ্ত এমএফএস অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে সনাক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করে ৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা ডিবি’র সহায়তায় কুমিল্লা সদরের এলিট প্যালেস হোটেলে অভিযান পরিচালনা করে আরও ৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণের জন্য তারা বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে কাজটি পরিচালনা করত।
অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনার কাজে অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্য কিছু পেমেন্ট কোম্পানি হল Pay Kashma, Gopay, Lucky pay, LQ pay, XE pay, Cool pay প্রভৃতি। বাংলাদেশ কেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। যার দরুণ তারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে। জুয়ার সাইট এবং অ্যাপস পরিচালনার জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এই অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার (ইউএসডিটি) ক্রয় করা হয়। পরবর্তীতে পেমেন্ট কোম্পানির দেওয়া ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ক্রিপ্টো ডলার পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, আমরা যে চক্রের মূল হোতা আরিফ সহ যে চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ জানা গেছে এখালে প্রায় দৈনিক ৫ কোটি টাকার মতন লেনদেন করা হতো। আরিফ আগেও গ্রেফতার হয়েছে তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে। আরিফ অবৈধ উপার্জনের টাকায় বিলাশী জীবনযাপন করে। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে একটি বিএমডব্লিউ উল্টে গেছে। এর পর সে আবার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনছে।
পুলিশে হাত থেকে বাঁচতে ভিন্ন কৌশলের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার যেখান থেকে তাকে ধরেছি সেখানেও সে তিনটা রুম বুকিং করেছিল। সে যে রুমে ছিল সেই রুমের ভাড়াই প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা। সে এখানে হয়তো চার-পাঁচ দিন থাকতো। এরপর পুলিশ যখন তাকে লোকেট করবে ঠিক তখন সে জায়গা পরিবর্তন করে অন্য কোন হোটেলে বা কক্সবাজারে নামি-দামি হোটেলে রুম ভাড়া করে থাকতো। দীর্ঘদিন সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই কৌশল অবলম্বন করতো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি এই চক্রের বস নাতান। তিনি একজন চাইনিজ নাগরিক।
দেশে জুয়ার সাইট থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক ভাবে আমাদের দেশে ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ট্রানজেকশন হচ্ছে।
এই অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।












