ময়মনসিংহে তরুণকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আবদুল খালেক।
ময়মনসিংহ নগরের মাসকান্দা এলাকায় মোহাম্মদ রাব্বি নামের এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আবদুল খালেক (২৭) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১৪। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নগরের রঘুরামপুর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আজ শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১৪ ময়মনসিংহের কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলন শেষে ছবি তোলার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিভিন্ন কথা বলেন গ্রেপ্তার আবদুল খালেক। এ সময় নিজের বাবাকে কুপিয়ে আহত করার প্রতিশোধ নিতে রাব্বিকে তিনি কুপিয়ে হত্যা করেছেন বলে জানান।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে আবদুল খালেক বলতে থাকেন, ‘শিক্ষিত মানুষ আমি। আমার কি কথা আছিল এইনো আওয়ার? আপনাগর কাজ যদি আপনারা সঠিক করতাইন, তাইলে আমার এইন আগুন লাগত না, বুঝ্ছইন না। সন্ত্রাসী মারছি, আমার বাপেরে কোপাইছে, আমিও কোপাইছি।’
নিহত রাব্বি (২৫) নগরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের জেলা পরিষদ হাইস্কুল রোডের মোড়লবাড়ি এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে। তিনি মাসকান্দা এলাকার আকাশ কম্পিউটারে চাকরি করতেন। গতকাল হত্যাকাণ্ডের পর সন্ধ্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘরে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।


নিজের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে আবদুল খালেক বলেন, ‘আমার বাড়িঘর পুড়াইছে, লুটপাট করছে কে? কোনো আইনের লোক তো বাঁচাইতে পারল না। যেইডি নিরীহ, হেইডির ওপরেই জুলুম; সবলগোরে পাইতো না। আমি বাইরইতে পারলে তাদের কপালে শনি আছে, যারা আমার বাড়িঘর পুড়াইছে।’
নিহত রাব্বির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে খালেক আরও বলেন, ‘হে (রাব্বি) প্রত্যেক দোকান থাইকা ২০০ টাকা করে চাঁদা তুলত। যারা না দিত, হেরেই মাইরা বইতো। আমি কখনো চাঁদাবাজি করি নাই। আমার এলাকায় গিয়া জিজ্ঞেস করে দেখেন। মারছি আমরা দুই ভাইয়েই। আঙ্গর বেশি লোক লাগে নাকি, আঙ্গর কি কইলজা নাই? আমার বাপেরে ওরা ১৫ জনে মিইল্লা কোপাইছে আর আমরা দুই ভাইয়ে মিইল্লা ওরে কোপাইছি।’
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, গতকাল দুপুরে মাসকান্দা এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনে রাব্বির ওপর একদল ব্যক্তি দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। হামলা থেকে বাঁচতে রাব্বি পাশের একটি দোকানে আশ্রয় নিলে হামলাকারীরা সেখানে ঢুকে তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। তাঁকে বাঁচাতে তাঁর ভাই মুহাম্মদ রিয়াদ এগিয়ে এলে তাঁকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে রাব্বিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।


ময়মনসিংহে তরুণকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাবের সংবাদ সম্মেলন।
র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর র্যাব সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার আট ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত আবদুল খালেককে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবদুল খালেক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে রাব্বিকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে তিনি বড় একটি দা বা হাঁসুয়া ব্যবহার করেছেন বলেও জানিয়েছেন।
র্যাব জানায়, ২০১৮ সালে রাব্বির পক্ষের লোকজন খালেকের বাবা ফজলুল হককে মারধর করেছিলেন এবং তাঁর একটি হাত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বলে খালেক দাবি করেছেন। ওই ঘটনার জেরে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। এ ছাড়া রাব্বির পক্ষের লোকজন এলাকায় ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে চাঁদা দাবি করতেন বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। এসব ক্ষোভ থেকে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। তবে খালেকের এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি র্যাব। অন্য কোনো পক্ষের বিরোধ বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মো. সামসুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি চারজনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের পেছনে আরও ৮ থেকে ১০ জনের একটি গ্রুপ থাকতে পারে। অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ঘটনার আগের দিন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সালিস হয়েছিল বলেও র্যাবের কাছে তথ্য এসেছে। তবে ওই সালিস চাঁদাবাজি-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাতে নিহত ব্যক্তির বাবা মোবারক হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। র্যাব একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।











