‘তুমি কে, আমি কে—ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে—শিক্ষামন্ত্রী’, ‘দফা এক দাবি এক—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’ এমন নানা স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষামন্ত্রীর কথিত কটূক্তির প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান শিক্ষার্থীরা।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষামন্ত্রীর কথিত কটূক্তির প্রতিবাদে ঢাকার দুটি স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ করছেন একদল শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে তারা সায়েন্স ল্যাব মোড় ও উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।
ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ধানমন্ডি থেকে নিউ মার্কেটমুখী সড়ক অবরোধ করেন। তাতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় আশপাশের এলাকায়। অনেক যাত্রীকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে—ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে—শিক্ষামন্ত্রী’, ‘দফা এক, দাবি এক—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘জ্বালো রে জ্বালো—আগুন জ্বালো’, ‘আপস না সংগ্রাম—সংগ্রাম, সংগ্রাম’—এমন নানা স্লোগান দেন। তাদের হাতে পরীক্ষা স্থগিত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।
বেলা দেড়টার পর আন্দোলনকারীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় ছেড়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
বেলা পৌনে ২টায় নিউ মার্কেট থানার এসআই সজীব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব ছেড়ে দিয়েছেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে গেছেন।”
পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের সামনে আন্দোলনকারীদের আটকে দেয় পুলিশ।
শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের আটকে দেওয়ার পর তাদের বেশিরভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিছু শিক্ষার্থী নীলক্ষেতের সড়কে অবস্থান নিয়েছেন।”
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়েই সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও দীর্ঘ যানজট, আবার কোথাও বিকল্প উপায়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বাসা থেকে বের হলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগের শিকার হন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মহসিন শেখ বলেন, “সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রে যেতে পারেনি। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছি।”
সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, “গতকালের (সোমবার) ভোগান্তির দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের কষ্টের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।”
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক কথোপকথন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আন্দোলনকারীরা।
ওই কথোপকথনে অধস্তন এক নারীর উদ্দেশে পুরুষ কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, “আমি এভাবে মিটিংয়ে বলতেছিলাম যে, এরা (এইচএসসি পরীক্ষার্থী) তো ফার্মের মুরগি, কিন্তু মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে, আমার মেয়ের তাই হয়। তো আমি বললাম যে, দৌড়-লাফ ঝাঁপ দিয়ে পরীক্ষা দিতে যাবে, বৃষ্টির মধ্যে মাথায় পানি পড়বে, পরের দিন ঠিকঠাক পরীক্ষা দিতে পারবি না। তারপরে আবার ওয়েদার ব্রডকাস্টিং সেন্টারে ডিজিকে কল করল। তারা বলল যে কালকে বৃষ্টি হবে না, আজকে রাতেই শেষ।”
বিএএফ শাহীন কলেজের এক পরীক্ষার্থী বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে। উনি অভিন্ন প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা বন্ধ। উনি কথা দিয়ে কথা রাখেননি।
“পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিয়ে যখন গতকাল সমালোচনা চলছে, তখন একটা ভিডিওতে দেখলাম উনি টেলিফোনে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগি বলে সম্বোধন করছেন। উনি কেন আমাদের ফার্মের মুরগি বলবেন? উনার এ বক্তব্যের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলননের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
এর আগে দুপুর সোয়া ১২টায় নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীরা কিছুক্ষণ আগে সায়েন্স ল্যাবের সড়কে মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছি।”
উত্তরা পশ্চিম থানার ডিউটি অফিসার শাহীন আলম দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শিক্ষার্থীরা পৌনে ১২টার দিকে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। এতে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি।”
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা না নেওয়াসহ তিন দফা দাবি ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের দাবিগুলো হচ্ছে—
• দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে।
• বৈরী আবহাওয়ার কারণে যেসব পরীক্ষার্থী ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
• আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে পদত্যাগ করতে হবে।












