কুমিল্লারবিবার, ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ প্রিভিউ: সূচি, স্কোয়াড এবং প্রেডিকশানসহ সম্পূর্ণ গাইড

প্রতিবেদক
Cumilla Press
জুন ১৩, ২০২৬ ৫:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দীর্ঘ ২৪ বছর কেটে গেছে। সাম্বার দেশে শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের ট্রফি এসেছিল সেই ২০০২ সালে। এতগুলো বছরের জমে থাকা পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপ এখন সেলেসাওদের কাঁধে। এবার সেই চাপ নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপে পা রাখলো ব্রাজিল। তবে এবারের পথটা মোটেও সহজ ছিল না। বাছাইপর্বের ম্যাচগুলো বর্তমান স্কোয়াডের ভেতরের নানামুখী দুর্বলতাগুলোকে একদম সামনে নিয়ে এসেছে।

অনেকদিন ধরেই ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি ছিল ব্রাজিল। ডরিভাল জুনিয়রের অধ্যায় ব্যর্থতায় শেষ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন। তারা বুঝতে পারে, খোলনলচে বদলে ফেলার সময় এসেছে। আর সেই বড় পরিবর্তনের খোঁজে তারা হাত বাড়ায় বাইরে। ১৯২৫ সালের পর প্রথম কোনো বিদেশি কোচকে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলে আসেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক বস কার্লো আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের চূড়া ছোঁয়া এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ডকে দলে আনার স্পষ্ট বার্তাটা এটাই যে— এবার আসলেই কিছু একটা বদলাতে হবে।


বাছাইপর্বের শেষদিকের কঠিন সমীকরণগুলো অবশ্য ভালোভাবেই পার করেছে ব্রাজিল। প্লে-অফের গ্যাঁড়াকলে পড়তে হয়নি, সরাসরিই টিকিট মিলেছে এই গ্রীষ্মের মূল মঞ্চের। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে পড়েছে তারা। নকআউট পর্বে যাওয়ার পথটা ব্রাজিলের জন্য বেশ সহজই বলা যায়। তবে এই গ্রুপে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হতে পারে আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কো।

তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে ব্রাজিল এক কঠিন সমীকরণে পড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নকআউট পর্বের সহজ ছক থেকে তারা ছিটকে যাবে। আর তা সেমিফাইনালে ওঠার পথটিকেও কঠিন করে তুলতে পারে।

ব্রাজিল দলে প্রতিভার কোনো কমতি নেই। তাই দেশের মাটিতে ভক্তদের প্রত্যাশার পারদ স্বভাবতই আকাশচুম্বী। কিন্তু এরপরেও বেশ কিছু প্রশ্নের সমাধান এখনো মেলেনি।

৩৪ বছর বয়সে নেইমারের দলে থাকাটা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানোর কারণ হতে পারে। গ্রেড-টু ক্যাফ স্ট্রেইনের (পায়ের পেশির চোট) কারণে তিনি ব্রাজিলের প্রস্তুতি ম্যাচগুলো থেকে ছিটকে গেছেন। যদিও আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাকে পাবার আশা করছে ব্রাজিল।

সেলেসাওদের ভবিষ্যৎ আশার আলো এখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই দেখা হচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় তিনি ১৬টি গোল করেছেন। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ টিকিটও নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার এই দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সের সাথে ব্রাজিলের হলুদ জার্সির সাধারণ রেকর্ডের ব্যবধানটা এখনো চোখে পড়ার মতো।

তারকাখচিত এই আক্রমণভাগকে এক সুতোয় গাঁথা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রিয় কোচ আনচেলত্তির সামনে থাকা সমস্যাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তবে তার ওপর ফুটবল বোর্ডের পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি এরইমধ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিজের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-তে পড়েছে ব্রাজিল। এই গ্রুপে তাদের সঙ্গী মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড।

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই এখন সেলেসাওদের মূল লক্ষ্য। কারণ রানার্স-আপ হলে তাদের নকআউট পর্বের কঠিন ব্র্যাকেটে পড়তে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, সেটি হলে পরের রাউন্ডগুলোর পথ কঠিন হয়ে যাবে।

অন্য দিকে, কোনোভাবে তৃতীয় হলে গ্রুপ পর্ব পার হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তখন সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের একটি হয়ে নকআউটে যেতে হবে। এতে প্রথম পর্বেই অবিশ্বাস্যভাবে ছিটকে যাওয়ার একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়!

আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘অ্যাটলাস লায়নস’ খ্যাত মরক্কো সমীহ জাগানো শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তারা সবাইকে চমকে দেয়। স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছায়। যদিও শেষ পর্যন্ত ফাইনালিস্ট ফ্রান্সের কাছে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। আর এ বছর তারা মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুটও জিতেছে।

মরক্কোর এই অভিজ্ঞ স্কোয়াডে আছেন আফকন তারকা ব্রাহিম দিয়াজ। তাদের সাথে আরও আছেন পিএসজির গতিময় ফুল-ব্যাক আশরাফ হাকিমি। আর গোলপোস্টের নিচে শক্তিশালী দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অভিজ্ঞ ইয়াসিন বুনু।

গ্রুপের অন্য দল হাইতি ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরছে। এত শক্তিশালী একটি গ্রুপে তাদের বেশ কঠিন লড়াই করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর বড় সমর্থন পাশে পাবে তারা।

একেবারে শেষ ম্যাচে মায়ামিতে ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে স্কটল্যান্ড। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে এই স্কটিশদের হারিয়েছিল সেলেসাওরা। তবে এবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই যদি শেষ ম্যাচ পর্যন্ত গড়ায়, তবে স্কটল্যান্ড ব্রাজিলের জন্য একটি বড় পরীক্ষা বা অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে।

গ্রুপ ‘সি’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনায় এগিয়ে আছে ব্রাজিল। সেটি হলে তারা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে সহজ ছকটিতে পা রাখবে। কারণ এই ছকে আর্জেন্টিনা নেই। এমনকি ফ্রান্স ও স্পেনও রয়েছে ব্র্যাকেটের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অংশে।

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে শেষ-৩২ দলের লড়াইয়ে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হতে পারে জাপান, তিউনিসিয়া, নেদারল্যান্ডস অথবা সুইডেন। সেই বাধা পার হতে পারলে শেষ-১৬-এর ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে পাশের অন্য একটি গ্রুপের রানার্স-আপ দলের।

এরপর কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চ সাজানো হবে মিয়ামিতে। সেখানে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ডের থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেই ম্যাচ জিতলে আগামী ১৪ জুলাই ডালাসের সেমিফাইনালে দেখা মিলতে পারে আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল অথবা কলম্বিয়ার।


কিন্তু কোনো কারণে ব্রাজিল যদি গ্রুপ ‘সি’’-তে রানার্স-আপ হয়, তবে পুরো দৃশ্যপট বদলে যাবে। তারা চলে যাবে ড্র-এর উপরের কঠিন অংশে। সেখানে প্রথম নকআউট ম্যাচেই তাদের খেলতে হবে গ্রুপ ‘এফ’-এর চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে।


এর ফলে খুব দ্রুতই ফ্রান্স বা স্পেনের মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপে প্রতিবারই ইউরোপের দলগুলোর কাছে হেরেই নকআউট পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল সেলেসাওদের।

গত ১৮ মে রিও ডি জেনিরোতে বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। আর সেদিন পুরো দল ঘোষণার আলো কেড়ে নেয় একটি বিশেষ নাম।

প্রায় তিন বছর আগে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল ইনজুরিতে পড়েছিলেন নেইমার। এরপর থেকে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাইরে। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সে এসেও নেইমার দলে ডাক পেয়েছেন।

সান্তোসে ফেরার পর নেইমারের পারফর্ম্যান্স অবশ্য খুব একটা আহামরি ছিল না। ফিটনেস সমস্যার কারণে দুটি প্রীতি ম্যাচেও তাকে বাইরে রেখেছিলেন আনচেলত্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মহাতারকাকে দলে নেওয়ার বড় ঝুঁকিটি তিনি নিয়েই নিলেন।

ব্রাজিল দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। তাই অনেক চেনা মুখকে বাদও পড়তে হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ৮টি আন্তর্জাতিক গোল নিয়ে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ স্কোরার রদ্রিগো ইনজুরির কারণে দলে নেই। বাদ পড়েছেন ৪১ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভাও, যার ঝুলিতে আছে ১১৩টি ম্যাচ ও ৪টি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। চেলসি ত্রয়ী হোয়াও পেদ্রো, আন্দ্রে সান্তোস ও এস্তেভাও চূড়ান্ত দলে জায়গা পাননি, যার মধ্যে এস্তেভাও ছিটকে গেছেন ইনজুরির কারণে।

বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালীন আরেকটি ধাক্কা খায় দল। চোটের কারণে স্কোয়াড থেকে ছিটকে যান রোমার ফুল-ব্যাক ওয়েসলি। তার জায়গায় দলে এসেছেন আতালান্তার মিডফিল্ডার এডারসন, যিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাচ্ছেন।

দল ঘোষণায় বেশ কিছু চমকও ছিল। গত মার্চে প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়া বোর্নমাউথের ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার রায়ান জায়গা করে নিয়েছেন মূল স্কোয়াডে। তার সাথে দলে আছেন ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো এবং আল-ইতিহাদের অভিজ্ঞ ফ্যাবিনিও।

এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ৯ সদস্যের এই আক্রমণভাগটি যেকোনো দেশের চেয়ে সবচেয়ে দামি। দলে জায়গা পাওয়ার জন্য ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, নেইমার, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, মাথেউস কুনিয়া, এনড্রিক, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে এবং রায়ানদের মধ্যে চলবে তীব্র লড়াই।

কোচ আনচেলত্তির প্রিয় ফর্মেশন ৪-২-৪। এই ছকে শুরুর একাদশে চারজন ফরোয়ার্ড একসাথে খেলার সুযোগ পাবেন। বাকিদের অপেক্ষা করতে হবে সাইড বেঞ্চে, ম্যাচে ইমপ্যাক্ট খেলোয়াড় হিসেবে নামার জন্য।