অপেক্ষার দিন শেষ হলো। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, চোটের ছায়া আর জাতীয় দল থেকে দূরে থাকার হতাশা পেরিয়ে আবারও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে ফিরলেন নেইমার।কার্লো আনচেলত্তির ঘোষণায় সান্তোস তারকার নাম উঠতেই যেন উৎসবের ঢেউ বয়ে গেল ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে।
বিশেষ আয়োজনে ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করছিলেন আনচেলত্তি।একে একে নাম পড়ছিলেন তিনি। এরপর যখন উচ্চারিত হলো নেইমারের নাম, মুহূর্তেই বদলে গেল পরিবেশ।করতালি, চিৎকার আর ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে পরের নাম ঘোষণার আগে কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকতে হয় ব্রাজিল কোচকে।
নেইমারের জন্য এই ডাক ছিল স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস। আর সমর্থকদের জন্য ছিল প্রিয় নায়কের ফিরে আসার আনন্দ। চোট আর ফিটনেসের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দল থেকে দূরে ছিলেন ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাই তার বিশ্বকাপ দলে ফেরা শুধু একটি দল ঘোষণার খবর নয়, অনেকের কাছে তা আবেগের পুনর্জন্ম।
ঘোষণার পর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে নেইমারের বাড়ির সামনেও। প্রিয় তারকার বিশ্বকাপ দলে ফেরার মুহূর্তটি উদ্যাপন করতে সেখানে জড়ো হন সমর্থকরা। যেন তারা জানিয়ে দিলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পরও নেইমারের প্রতি ভালোবাসা কমেনি একটুও।
দল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে নেইমারকে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন আনচেলত্তি। ব্রাজিল কোচ বলেন, ‘আমরা সারা বছর নেইমারকে মূল্যায়ন করেছি। গত বছর সে ধারাবাহিকভাবে খেলেছে এবং ভালো শারীরিক অবস্থায় আছে। এই বিশ্বকাপের জন্য সে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তবে তার ভূমিকা ও দায়িত্ব অন্য ২৫ জনের মতোই, সে খেলুক অথবা বেঞ্চে থাকুক।’
নেইমারের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন ছিল ফিটনেস। আনচেলত্তিও সেটিই তুলে ধরেন স্পষ্টভাবে। তিনি বলেন, ‘সারা বছর আমরা যা মূল্যায়ন করেছি, তা হলো তার ফিজিক্যাল কন্ডিশন। নেইমারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল শারীরিক। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে সে ধারাবাহিকভাবে খেলার সময় পেয়েছে এবং বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে নিজের অবস্থা আরও ভালো করার সুযোগ পাবে।’
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নেইমারের অভিজ্ঞতাকেও বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন আনচেলত্তি। তার ভাষায়, ‘এ ধরনের প্রতিযোগিতায় তার অভিজ্ঞতা এবং দলের প্রতি তার ভালোবাসা ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারে। দলকে সেরা পারফরম্যান্স করতে সাহায্য করতে পারে।’
নেইমারের ডাক পাওয়ার খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। সাবেক ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার মার্সেলো ইনস্টাগ্রামে বিশেষ ভিডিও পোস্ট করে উদ্যাপন করেন প্রিয় সতীর্থের ফেরা।
ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোও নেইমারের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘আমি আগেই জানতাম! এবার আসছে ষষ্ঠ শিরোপা!’
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ হবে নেইমারের ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। এর আগে ২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ, ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে খেলেছেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়টা নেইমারের জন্য ছিল অপেক্ষা আর পরীক্ষার। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আমেরিকান বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-০ গোলের হারের পর আর ব্রাজিলের হয়ে খেলেননি তিনি। তখন দলের কোচ ছিলেন ফের্নান্দো দিনিজ।
এরপর দোরিভাল জুনিয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর আল হিলালে খেলার সময় জাতীয় দলে ডাক পাননি নেইমার। আনচেলত্তির অধীনেও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় ছিলেন না তিনি। চোট তাকে দীর্ঘ সময় দূরে রেখেছিল হলুদ জার্সি থেকে।
এবার সেই জার্সির ডাক আবার এসেছে। নেইমারের জন্য এটি যেমন উপহার, তেমনি দায়িত্বও। কারণ তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাশা, স্মৃতি, ভালোবাসা আর ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে নেইমার ফিরছেন…সমর্থকদের কাছে এ খবরই যেন উৎসব। এখন অপেক্ষা, মাঠে সেই পুরোনো জাদু আবার ফুটে ওঠে কি না।












