সন্ধ্যা নামলেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা নদীতে বাড়ে ড্রেজারের আনাগোনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় নদী স্বাভাবিক থাকলেও রাত গভীর হলে বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। রাতভর বালু উত্তোলনের পর ভোর হওয়ার আগেই অনেক সময় ড্রেজার সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উপজেলার নাছিরাকান্দি, বোরচর, চরওয়েস্টারসহ মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বালু উত্তোলন চলছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়ায় বালু উত্তোলনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে নদীতীরবর্তী ফসলি জমি, বসতভিটা ও জনবসতি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে নদীর তীরের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ভাঙন বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মেঘনা-ধনাগোদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধেও।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি গত ৩১ আগস্ট মতলব উত্তর উপজেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভাতেও ওঠে। সভায় নাছিরাকান্দি, বোরচর, চরওয়েস্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। সেখানে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত হয়।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সভার সিদ্ধান্তের পরও নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের সভায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ওঠার পরও রাতের আঁধারে নদীতে ড্রেজার নামছে কীভাবে। নদীতে রাতের নজরদারি কার্যকর না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
বোরচর গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, সন্ধ্যার পর থেকেই নদীতে ড্রেজারের শব্দ শোনা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালু উত্তোলনের তৎপরতাও বাড়ে। মেঘনার বুকে থাকা সাতটি চর এলাকার বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের তৎপরতা রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। এতে নদীর তীরের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বোরচর গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, রাতভর ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সংশ্লিষ্টরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। নদীভাঙন হলে প্রথমেতাঁদের বসতভিটা ও ফসলি জমিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রশাসনের অভিযান হলে কিছুদিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও ড্রেজার নামে। শুধু ড্রেজার জব্দ বা জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা-ধনাগোদা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা অবকাঠামো। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বাঁধের কাছাকাছি নদী থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে তীরের মাটি দুর্বল হয়ে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বেড়িবাঁধও।
একই সঙ্গে মতলব উত্তর উপজেলায় প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইকোনমিক জোন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তবে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়লে ভবিষ্যতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর কোন এলাকায় কতটুকু বালু উত্তোলন হচ্ছে এবং এর ফলে নদীর তলদেশ ও তীরের ওপর কী প্রভাব পড়ছে—এসব বিষয়ে কার্যকর বৈজ্ঞানিক নজরদারি নেই। তাদের মতে, দীর্ঘদিন একই এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর গভীরতা ও স্রোতের গতিপথে পরিবর্তন আসতে পারে, যা ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে নতুন যোগদান করেছি। নদীতে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা নদীতে বিশেষ করে রাতের বেলায় নৌ পুলিশের টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।’
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘মতলব উত্তরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত নদীতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও পরে একই এলাকায় আবার ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মেঘনা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, স্থায়ী নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতে নদীতে টহল জোরদার, ড্রেজারের অবস্থান শনাক্ত, বালু পরিবহনের নৌযান ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তাদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতভিটা ও ৬৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পাশাপাশি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অঞ্চলও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।











