কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করবেন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারকে অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন দিয়ে গালাগাল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করবেন বলে সমকালকে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় সমকালকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়ে জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অপ্রতিম হত্যা মামলার প্রথমে তদন্ত শুরু করেন সদর দক্ষিণ মডেল
থানার এসআই সাইফুল ইসলাম। তবে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় তা পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। থানার এসআই সাইফুল ইসলাম সমকালকে জানান, এ মামলা এখন থেকে তদন্ত করবেন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ। মামলার যাবতীয় নথিপত্র দ্রুত হস্তান্তর করা হবে। রাজিব আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আদেশ হয়েছে। নথিপত্র পাওয়ার পর তদন্তকাজ শুরু করা হবে। আশা করি, শিগগিরই তদন্তের পর দ্রুততম সময়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারব।’
ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিনজনের স্বীকারোক্তি মিলেছে। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন
নিহত অপ্রতিমের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারকে অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হয়। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। অপ্রতিমের বাবা পরিচয় দিতেই অন্য প্রান্তের লোক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরপর তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করে। তিনি ফোন কেটে দিলেও ক্রমাগত কল দিতে থাকে। তিনি নম্বরটি ব্লক করেন। পরে অন্য আরেকটি নম্বর থেকে বারবার কল দেওয়া হয়।
ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার ছেলে খুন হয়েছে। তাকে আইফোনের জন্য মারা হয়েছে নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, সেটা আমরা জানি না। আমাদেরও শঙ্কা কাজ করে। মাঝেমধ্যে কিছু মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে, কিন্তু পরিচয় দেয় না। সেদিন কল দিয়ে খুব বাজে ভাষায় গালাগাল করা হয়।’ তিনি জানান, মোবাইলে ফোন দেওয়া ব্যক্তির বয়স খুব অল্প মনে হয়েছে।
ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার ছেলেকে মেরে ফেলার পরে আসামিরা আমার সঙ্গে এসে আমার ছেলেকে খুঁজেছে। এখন তাদের লিডাররাও যে আমার বাসায় এসে আমার সঙ্গে কোলাকুলি করছে না, এর নিশ্চয়তা কী? পুলিশ তদন্তের স্বার্থে কিছু বলছে না। কিন্তু এর একটা বিহিত না হলে কীভাবে হবে। আমরা নিরাপত্তার শঙ্কায় আছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুর পর থেকে অনেকেই বাসায় আসছে। গণমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার লোকজন আসছেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন। অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীও আসছেন। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের আমরা চিনি না। ফলে আমাদের ভয় হচ্ছে, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা হচ্ছে। আমি থানায় জিডি করব।’
চার দিন পরও জিডি না করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘ছেলেকে হারিয়েছি। আমরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় হুমকি-ধমকি আসছে। থানায় দৌড়ঝাঁপ করার মতো শক্তিটুকুও পাচ্ছি না।’ তবে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা জিডি করব। ডিবিকেও বিষয়টি জানাব।’
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা থেকে অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। অপ্রতিমকে উদ্ধারে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালানোর পর সানন্দার নির্জন পাহাড়ি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন ‘কেবিজি’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
গত বুধবার কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক রাতে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ৪৫১ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অপরাধে বাকি ১৭৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
৯৮টি মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ২৬৩
কুমিল্লায় ২৪ ঘণ্টায় ৯৮টি মাদকবিরোধী অভিযানে ২৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। এসব অভিযানে ১৮৫ কেজি গাঁজা, ৩৩৯ পিস ইয়াবা ও ৭২ বোতল ইস্কাপ সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জেলা পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, অভিযানে ২২ জন মাদক ব্যবসায়ী ও ৭৪ জন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন মামলায় ১৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।












