পুঁজিবাজারের চার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) ও সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিসিবিএল) সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে ‘দ্য কারেন্ট স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক উন্মুক্ত আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এ আলোচনার আয়োজন করে।
মাসুদ খান বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভালো মানের কোম্পানি তালিকাভুক্তি, আইপিও ব্যবস্থায় পরিবর্তন, লেনদেনের পর এক কার্যদিবসে নিষ্পত্তি (টি+১) ও ডেরিভেটিভস বাজার চালুর উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক ও হোসাইন সাদাত এবং ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারসহ বাজারসংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
নতুন মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান উদ্যোক্তা বা শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ রেখে আইপিওতে ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি তার মোট মূলধনের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে ছাড়লে এর ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ এবং বাকি ৫ শতাংশ বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে ছাড়তে পারবে। এতে কোম্পানি নতুন মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ারধারীরাও শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন। এ–সংক্রান্ত বিধি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, এক মাসের মধ্যে আইপিও–সংক্রান্ত নতুন বিধি দেওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, ভালো কোম্পানি বাজারে আসা শুরু করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগও সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
সিসিবিএলের বোর্ড আগামী এক মাসের মধ্যে পুনর্গঠন করা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সিসিবিএল গঠন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগোয়নি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।
আধুনিক পুঁজিবাজারে কেন্দ্রীয় কাউন্টারপার্টি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, লেনদেনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ক্লিয়ারিং ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সিসিবিএলের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
লেনদেনের পর এক কার্যদিবসে নিষ্পত্তি বা টি+১ ব্যবস্থা বছরের শেষ নাগাদ চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, বিদেশি ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি এসব পক্ষকে নিয়ে একটি রোডম্যাপও তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘স্ক্রিপ্ট নেটিং’ চালুর কাজ চলছে। মার্জিন ঋণ, ক্লিয়ারিং, সিসিপি ঘাটতি ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেশন আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ডেরিভেটিভস বাজার চালুর প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও বিভিন্ন কারণে কার্যক্রম থেমে ছিল বলে জানান তিনি। মাসুদ খান বলেন, এখন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রোকার নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়া হবে। ডেরিভেটিভস পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারিং ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বিষয়েও কাজ চলছে।
পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন ওঠানামায় বিএসইসি হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কমিশন প্রতিদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করে। তবে বাজার ওঠানো বা নামানোর জন্য কোনো ব্রোকারেজ হাউসে কমিশনের পক্ষ থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না। ‘মার্কেট তার নিজের শক্তিতে চলবে’— এমন অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন বা দর ওঠানামা দেখা গেলে তদন্ত করা হবে। অনিয়ম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ।
পুঁজিবাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা যায় কি না, তা বাজারসংশ্লিষ্টদের দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বন্ড বাজারের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, মূল বাজারে আরও বেশি বন্ড তালিকাভুক্ত হলে মিউচুয়াল ফান্ড, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলের (ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড) কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এর পরিবর্তনের সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বিএসইসির পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে জানিয়ে মাসুদ খান বলেন, সব প্রতিষ্ঠানে একইভাবে পরিদর্শন না করে ঝুঁকির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হবে।
বড় অর্ডার বা ধারাবাহিক লেনদেনের মাধ্যমে কোনো শেয়ারের বাজারদর প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হবে বলেও জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতেও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সূচক, বিশেষ করে এমএসসিআই সূচকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি এবং বাজার অবকাঠামোর উন্নয়ন দেখা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে পারে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ভালো মানের কোম্পানি ও বন্ড তালিকাভুক্ত করতে লিস্টিং ফি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। আইপিও ও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত ফি সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করলে এই কমানো ফিতেও আরও ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে আইপিও বা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের আবেদন করলে এ সুবিধা পাওয়া যাবে।
মমিনুল ইসলাম বলেন, নতুন কোম্পানি ও বন্ড তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে উচ্চ লিস্টিং ফি একটি বড় বাধা। নতুন ইস্যুয়ারদের উৎসাহিত করতেই ফি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লেনদেনের গতি বাড়াতে টি+১ ও ‘স্ট্রিপ নেটিং’ ব্যবস্থা চালুর প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক প্রস্তুতির অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এগুলো কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্বমানের তথ্যসেবা দিতে ডিএসইর ওয়েবসাইট নতুন করে সাজানোর কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
বন্ডের তালিকাভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান ডিএসই চেয়ারম্যান। বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী বন্ড অনুমোদনের ক্ষেত্রে লিস্টিং বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা রয়েছে, সেগুলো দূর করার কাজ চলছে।
ডিএসইর ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান মমিনুল ইসলাম। তবে এতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর নিজস্ব দায়বদ্ধতা কমবে না।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, বাজারের উন্নয়ন ও সুশাসন জোরদারে ডিএসই ও বিএসইসি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ভালো মানের আইপিও আনা, ফ্রি মার্জিন ও সিসি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং আগামী পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ চলছে।












