ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় শুরু থেকেই একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা আলোচনায় আসছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক চার জনও এমন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশও শুরু থেকে বলছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নিতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আইফোন, বাঁশের লাঠির আঘাত, জঙ্গলে ফেলে যাওয়া রক্তাক্ত দেহ এবং সবশেষে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সব মিলিয়ে পুলিশ এমন ধারণায় পৌঁছেছে।
অভিযুক্ত চার জনের দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যায়, অভিযুক্ত বাকিদের বিচার হবে এবং আরও কিছুদিন আলোচনা চলবে এ নিয়ে। কিন্তু এরপর খবরটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে অন্য কোনো খবরের ভিড়ে এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে নৈতিক চরিত্র ঙ্খলনের দায়ে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের আত্মহত্যা এরই মধ্যে সেই সব খবরের একটি হিসেবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তরা ধরা পড়েছে ঠিকই। প্রশ্ন হলো, যে সমাজে একটি আইফোন একটি শিশুর জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, সেই অসুখের চিকিৎসা কে করবে? সেই তরুণদের হত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া আকাঙ্ক্ষা, ভোগবাদ আর সামাজিক অবক্ষয়ের দায় কোথায়?
এই প্রশ্নগুলো তোলার অর্থ এই নয় যে অপরাধীদের দায় খাটো করে দেখা হচ্ছে। দায় স্বীকার করেই চিন্তা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে, অপরাধ কখনও শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। প্রতিটি অপরাধের পেছনে একটি পরিবেশ থাকে, যে পরিবেশ অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করে, কখনও কখনও তাকে আরও সহজ করে তোলে। সেই পরিবেশ বোঝা মানে অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া নয়; ভবিষ্যতের আরেকজন অপ্রতিমকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।
একটি ফোন কীভাবে একজন মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সাধারণত বস্তুকে দোষ দেই না, দোষ দেই মানুষকে। কিন্তু বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তার জন্য একটি জীবনকে মুছে দেওয়া যায়, তাহলে সেই আকাঙ্ক্ষা তৈরির সামাজিক প্রক্রিয়াকে নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে হবে।
একটি স্মার্টফোন আজ আর কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এটি একধরনের সামাজিক মর্যাদার প্রতীক, পরিচয়ের অংশ, বন্ধুমহলে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি। বিশেষত কিশোর-তরুণদের জগতে, যেখানে আত্মপরিচয় গঠনের প্রক্রিয়াটা এখনও অসম্পূর্ণ, সেখানে আইফোন বা একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ফোন হয়ে উঠতে পারে একজনের আত্মপরিচয়ের অংশ। আর এই বাস্তবতা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে বিজ্ঞাপনের সর্বব্যাপী উপস্থিতিতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনমূলক জীবনযাপনের প্রতিযোগিতায় এবং এমন এক অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে ভোগই সাফল্যের দৃশ্যমান প্রমাণ হয়ে উঠেছে।
তাই শুধু ‘ভোগবাদ খারাপ’ বলে দায় সারলে চলবে না। প্রশ্ন তুলতে হবে, আমরা কী ধরনের সমাজ তৈরি করেছি? যেখানে বস্তু শুধু প্রয়োজন মেটায় না, হয়ে ওঠে সামাজিক অবস্থানের স্মারক, এমনকি আত্মমূল্যায়নের মানদণ্ড! যে সমাজে থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘আমার কাছে কী আছে’ প্রশ্নের উত্তর, সেই সমাজে অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হয় প্রতিদিন। যেখানে বিজ্ঞাপনে, তুলনামূলক আলাপে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে একজনের সাফল্য মাপা হয় তার ভোগের প্রদর্শনী দিয়ে।
একটি অপরাধ হঠাৎ করে ঘটে না। তার চারপাশে জড়িয়ে থাকে অনেকগুলো সূত্র—আকাঙ্ক্ষা, বঞ্চনা, ভোগের প্রদর্শন, সামাজিক তুলনা, অপরাধের ক্রমশ স্বাভাবিকীকরণ, সহিংসতার প্রতি বেড়ে চলা সহিষ্ণুতা, শিশু-কিশোরদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল তত্ত্বাবধান, বন্ধুত্ব ও সঙ্গীর প্রভাবের জটিল সমীকরণ এবং সবকিছু দ্রুত পাওয়ার এক অস্থির সংস্কৃতি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন কিশোর। এই বয়সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সমবয়সীদের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হয়েছে। শিশু-কিশোর অপরাধ নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, এই ধরনের অপরাধের পেছনে প্রায়ই একাধিক স্তরের ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে থাকতে পারে পারিবারিক তত্ত্বাবধানের ঘাটতি, বিদ্যালয়ের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ, বেকারত্ব বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হতাশা এবং এমন এক সামাজিক পরিমণ্ডল, যেখানে সহিংসতা বা অপরাধ ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ একটি সমাধান-পদ্ধতি হয়ে ওঠে।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন বা মূল্যবান বস্তু ছিনতাইকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর এসেছে গণমাধ্যমে। কখনো রিকশাযাত্রীকে ছুরিকাঘাত, কখনো পথচারীর গলা বা হাত কেটে ফোন ছিনিয়ে নেওয়া, কখনো কিশোর গ্যাংয়ের সংঘাতে প্রাণহানি। প্রতিটি ঘটনার পরই একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়- তাৎক্ষণিক ক্ষোভ, গ্রেপ্তার, বিচারের দাবি, তারপর নীরবতা।
কিন্তু প্রশ্ন তোলা জরুরি, কেন বারবার এই একই ধরনের অপরাধ ঘটছে? কেন একটি বস্তুগত লোভ এত সহজে সহিংসতায় রূপান্তরিত হচ্ছে? কেন আকাঙ্ক্ষা আর সুযোগের মধ্যে ফারাক থেকে সহিংসতা জন্ম নিতে পারে? তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। এই বিশ্লেষণকে যদি সরাসরি ‘সমাজই আসল খুনি’ এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে বাস্তবের জটিলতাকে অতি সরল করে দেখা হবে।
সমাজ কোনো একক সত্তা নয়, যাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। বরং সমাজ একটি জটিল ব্যবস্থা, যার ভেতরে অসংখ্য প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। কিছু প্রক্রিয়া অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়, কিছু প্রক্রিয়া তা কমায়। প্রশ্ন হলো, অপ্রতিমের ক্ষেত্রে ঠিক কোন কোন প্রক্রিয়া মিলে একটি হত্যার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল? কেন একদল কিশোর ও তরুণের কাছে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়াও সম্ভব হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর একটি লেখায় সম্পূর্ণভাবে দেওয়া সম্ভব নয় এবং সেটা এই লেখার উদ্দেশ্যও নয়। উদ্দেশ্য হলো প্রশ্নগুলো সাজিয়ে রাখা, যাতে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেও প্রশ্নগুলো জীবিত থাকে। কারণ আইন হত্যাকারীকে চিহ্নিত করবে, আদালত তার অপরাধের বিচার করবে। কিন্তু সমাজ যদি জানতে না চায়, একজন কিশোরের কাছে একটি ফোন কীভাবে একজন মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠল, তাহলে কেবল একটি হত্যার বিচার হবে। অক্ষত থেকে যাবে এর পেছনে কাজ করা কারণগুলো। হয়তো আরেকটি অপ্রতিমের জন্য অপেক্ষা করবে ভবিষ্যৎ।
প্রশ্ন তোলা জরুরি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও। আজকের নগরকেন্দ্রিক পরিবারগুলোতে অভিভাবকদের কর্মব্যস্ততা, যৌথ পরিবারের ভাঙন এবং সন্তানের ডিজিটাল জগতের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা, সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একধরনের তত্ত্বাবধানের ঘাটতি। যেখানে একজন শিশু বা কিশোর নিজের মূল্যবোধ গঠন করে মূলত সমবয়সীদের কাছ থেকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম থেকে, বিজ্ঞাপনের ভাষ্য থেকে। পরিবার ও অভিভাবকের ভূমিকা সেখানে দুর্বল হয়ে গেছে বলেই অনুমান করি। বিদ্যালয়ও প্রায়শই কেবল পাঠ্যক্রম শেখানোর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দক্ষতা কিংবা মানসিক সুস্থতার পরিচর্যার জায়গা হিসেবে তার ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত।
তাই অপ্রতিমের মৃত্যু একটি সতর্কবার্তা। যা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, সামাজিক কাঠামোয় কোথায় কোথায় ফাটল ধরেছে। বিচার প্রক্রিয়া তার নিজের গতিতে চলবে এবং তা চলা উচিতও। অপ্রতিমের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের সেই গভীরতর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হবে, যেগুলো এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করা সামাজিক বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে।
তাই ভোগবাদের সংস্কৃতিকে প্রশ্ন করতে হবে। শিশু-কিশোর-তরুণদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। পরিবার ও বিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের চারপাশে সহিংসতা ও অপরাধ কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, সেটিও ভেবে দেখতে হবে।
যে সামাজিক কারণগুলো একটি ফোনকে একটি জীবনের চেয়ে মূল্যবান করে তোলে, সেই কারণগুলোও তো এক অর্থে ‘খুনি’। আর এসব নিয়ে যতদিন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, ততদিন অপ্রতিমের মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে। আরেকটি মামলা, আরেকটি রায়, আরেকটি ভুলে যাওয়া নাম। বিচার যেখানে শেষ হয়, সমাজের প্রশ্ন সেখানে শেষ হতে পারে না।











