১৯৩০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬ বার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উঠে প্রতিবারই ফাইনালে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন একটা রেকর্ড খুব কম দলেরই আছে— সেমিফাইনালে ওঠা মানেই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত। আর্জেন্টিনার বেলায় এই সমীকরণ এখনো একবারও ভাঙেনি। ১৯৩০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯০, ২০১৪ ও ২০২২ সালে যতবার তারা শেষ চারে উঠেছে, প্রতিবারই ফাইনালে পা রেখেছে। সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সপ্তমবারের মতো সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে দল, আর এবার পরীক্ষা নিতে সামনে ইংল্যান্ড।
আর্জেন্টিনার নকআউট মানসিকতা
এই পরিসংখ্যান নিছক কাকতালীয় নয়— এর পেছনে রয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবলের নির্দিষ্ট একটা মানসিকতা, নকআউট পর্বের চাপের মুহূর্তে ভেঙে না পড়ার দীর্ঘ ইতিহাস। এবারের আসরেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। কেপভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে প্রতি ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে রুদ্ধশ্বাস জয় পেয়েছে দলটি, বারবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও একই চিত্র দেখা গেছে— ১০ম মিনিটে আলেক্সিস মাক আলিস্তারের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ৬৭ মিনিটে সমতা ফেরায় প্রতিপক্ষ, তবে ব্রেল এমবোলোর লাল কার্ডে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হলে অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেস ও লাউতারো মার্তিনেসের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
ইংল্যান্ডের পথ ছিল ভিন্ন
বিপরীতে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠার পথটা কিছুটা আলাদা। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ চারে পৌঁছেছে থমাস টুখেলের দল। তবে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় সমানে সমান লড়াই হয়েছে; আর্জেন্টিনার মতো বারবার পিছিয়ে পড়ে ফেরার পরীক্ষা তাদের দিতে হয়নি। মানসিক দিক থেকে এই তফাত ১৫ জুলাইয়ের ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইংল্যান্ড এর আগে তিনবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উঠেছে— ১৯৬৬, ১৯৯০ ও ২০১৮ সালে। এর মধ্যে মাত্র একবার, ১৯৬৬ সালে, তারা ফাইনালে পৌঁছাতে পেরেছিল, যা পরে দেশটির একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপায় রূপ নেয়। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের নিজস্ব সেমিফাইনাল রেকর্ডও সাদামাটা নয়— বরং এবার তাদের সামনেও পুরনো ব্যর্থতা মুছে ফেলার সুযোগ।
কোথায় ভাঙতে পারে আর্জেন্টিনার রেকর্ড
মাঠের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার রেকর্ড ভাঙার সম্ভাব্য কয়েকটি জায়গা রয়েছে। প্রথমত, রদ্রিগো ডি পল ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মতো ডিফেন্ডাররা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে যে আগ্রাসী কৌশল নেন, তা রেফারির কড়া সিদ্ধান্তে ব্যুমেরাং হয়ে গেলে সংখ্যাগত সুবিধা হারাতে পারে দল। দ্বিতীয়ত, ডিক্লান রাইসকে শ্যাডো হিসেবে ব্যবহার করে ইংল্যান্ডের কাউন্টার-প্রেসিং যদি মেসির হাফ-স্পেস ভূমিকা কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল সরবরাহ লাইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইতিহাস ও পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার পক্ষে
তবে সার্বিক বিচারে পাল্লা ভারী আর্জেন্টিনার দিকেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত হওয়া ৫টি মুখোমুখি লড়াইয়ে ৩ জয় নিয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও, নকআউট পর্বের আসল পরীক্ষায় শেষ হাসি সবসময় হেসেছে আর্জেন্টিনাই— ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ১৯৯৮ সালে টাইব্রেকার জয় তার প্রমাণ। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ালে আর্জেন্টিনার হাতে আছে বাড়তি অস্ত্র— গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, যিনি পেনাল্টি টেকারদের মানসিকভাবে চাপে ফেলতে সিদ্ধহস্ত। বিপরীতে ইংল্যান্ডের রয়েছে দীর্ঘদিনের পেনাল্টি-জুজুর ইতিহাস।
২১ বছর পর মুখোমুখি, প্রথমবার মেসি
এই লড়াইয়ে যোগ হয়েছে আরেকটা ঐতিহাসিক মাত্রা। দীর্ঘ ২১ বছর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড— শেষবার তারা মুখোমুখি হয়েছিল ২০০৫ সালে জেনেভায় এক প্রীতি ম্যাচে, যেখানে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে তরুণ মেসি দলে ছিলেন না, ফলে দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সে এখন আর ৯০ মিনিট দৌড়াতে পারেন না মেসি, তবে তার পাসিং এখনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে— আর্জেন্টিনার এই ঐতিহাসিক রেকর্ড ধরে রাখার লড়াইয়ে হয়তো এটাই তার শেষ সুযোগ থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে।












