হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে জখম হওয়া বাঘিনীটিকে সুস্থ করে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দিল বন বিভাগ, তবে সুন্দরবনে বাঘের জন্য বড় হুমকি হয়ে থাকছে অবৈধ হরিণ শিকার
একটি বাঘিনী ছয় মাস পর আবার সুন্দরবনের গভীরে ফিরে গেছে— খবরটা শুনতে যতটা স্বস্তির, বাস্তবতা ততটাই জটিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকে পড়া এই বাঘিনীর উদ্ধার ও পুনর্বাসনের পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি— যেখানে সাফল্য আছে, কিন্তু সেই সাফল্যের ভিত নড়বড়ে।
একটি উদ্ধার, একাধিক প্রশ্ন
ঘটনার শুরু ছয় মাস আগে, শ্যালা নদী তীরবর্তী আন্ধারমানিক এলাকায়। খাল পুনঃখননের কাজ চলাকালে স্থানীয় কিশোরদের চোখে পড়ে সিন্থেটিক দড়ির ফাঁদে আটকে থাকা একটি বাঘিনী। বন বিভাগের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে বাঘিনীটি উদ্ধার হলেও, এমন একটি জটিল বাস্তুতন্ত্রে পূর্ণবয়স্ক বেঙ্গল টাইগারকে বাঁচানো মোটেও সাধারণ কৃতিত্ব নয়— এটি প্রমাণ করে বন বিভাগের সীমিত সম্পদ নিয়েও কার্যকর সক্ষমতার অস্তিত্ব রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই সাফল্য কি টেকসই? উত্তর খুঁজতে গেলে নজর দিতে হবে তিনটি নির্দিষ্ট দিকে— প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত, জনবল সংকট এবং মূল কারণ হরিণ শিকার।
রেডিও কলার বিতর্ক: প্রযুক্তি বনাম ঝুঁকি
বাঘিনীটিকে বনে ফেরানোর সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বন বিভাগকে— তার গলায় রেডিও কলার পরানো হবে কি না। ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী মো. আনোয়ারুল ইসলামের মতে কলার পরানো হলে বাঘিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বাঘ সংরক্ষণে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কলার না পরানোর সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে অতীতের এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। ২০০৪ ও ২০০৬ সালে ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যাডাম বার্লোর গবেষণায় কলার পরানো দুটি বাঘই পরবর্তীতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়— যদিও কলার পরানোই মৃত্যুর কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। এই অনিশ্চয়তাই সুন্দরবনে বাঘ ট্র্যাকিং প্রযুক্তির ব্যবহারকে বছরের পর বছর সীমিত রেখেছে। বিকল্প হিসেবে এবার বসানো হয়েছে ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ— একটি কম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কম কার্যকর পদ্ধতি, কারণ এতে বাঘের প্রতিদিনের গতিবিধি নয়, শুধু নির্দিষ্ট স্থানের উপস্থিতি জানা সম্ভব।
আধুনিক GPS স্যাটেলাইট কলার প্রযুক্তি এখন অনেক হালকা ও নিরাপদ হলেও বাংলাদেশে সুন্দরবনে এখনো ব্যাপকভাবে তা ব্যবহৃত হয়নি। এই প্রযুক্তিগত ব্যবধান বাঘ সংরক্ষণ গবেষণার সক্ষমতা সীমিত করে রেখেছে বলে মনে করেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
মূল সংকট: হরিণ শিকার ও জনবল ঘাটতি
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ হলো সুন্দরবনে অবৈধ হরিণ শিকারের চিত্র। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন নতুন ফাঁদ ধ্বংস করেও পরদিনই আবার নতুন ফাঁদ পাতা হচ্ছে— একটি প্রায় নিরন্তর লড়াই, যা সীমিত জনবল দিয়ে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্যাটি শুধু হরিণের জন্য নয়, বাঘের জন্যও সরাসরি হুমকি। খাদ্যশৃঙ্খলের হিসাবে হরিণ বাঘের প্রধান শিকার্য প্রাণী। হরিণের সংখ্যা কমে গেলে বাঘের খাদ্যাভাব তীব্র হয়, যা তাদের লোকালয়মুখী করে তোলে ও মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জে এই সংঘাত সবচেয়ে তীব্র রূপ নিয়েছিল, প্রায় প্রতি রাতেই গ্রামে বাঘ প্রবেশের ঘটনা ঘটত।
সময়ের সঙ্গে এই সংঘাত কমে আসাটা ইতিবাচক দিক— গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের ফলে সর্বশেষ ২০১৮ সালের পর কোনো বাঘ হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত কমে যাওয়া মানেই সমস্যা সমাধান নয়— বরং এটি একটি ভঙ্গুর ভারসাম্য, যা হরিণ শিকার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যেকোনো সময় আবার বিগড়ে যেতে পারে।
সংখ্যায় সুন্দরবনের বাঘ
২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। বিশ্বব্যাপী বেঙ্গল টাইগারের সংরক্ষণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সংখ্যা তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও, সুন্দরবনের ক্রমহ্রাসমান বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চাপের প্রেক্ষাপটে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনিরুল এইচ খানের মতে, উদ্ধারকৃত এই বাঘিনী স্ত্রী হওয়ায় এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠায় আগামী কয়েক বছরে নতুন শাবকের জন্ম দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি বাঘিনীর উদ্ধার-মুক্তির এই ঘটনা প্রমাণ করে, বন বিভাগের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা কার্যকর। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি কাঠামোগত সমস্যাও উন্মোচন করে— যতক্ষণ না হরিণ শিকার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে এবং বন বিভাগের জনবল বাড়ানো হচ্ছে, ততক্ষণ এই ধরনের উদ্ধার অভিযান শুধু উপসর্গের চিকিৎসা হয়ে থাকবে, মূল রোগের নয়। সুন্দরবনের ১২৫টি বাঘের ভবিষ্যৎ আসলে নির্ভর করছে এই কাঠামোগত সংকট সমাধানের ওপরই।












