ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। তবে মাঠের বীরত্বের চেয়েও বেশি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল ম্যাচ শেষে তার সেই কান্নার দৃশ্য। ভিসা জটিলতা ও অর্থাভাবে তার মা গ্যালারিতে থাকতে পারেননি—এই আক্ষেপই তাকে অশ্রুসিক্ত করেছিল। তবে এই আবেগঘন গল্পের অবশেষে একটি সুখকর সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
ভোজিনিয়ার মা আনা ক্যান্ডিদা এভোরা তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে, কিন্তু আমি আনন্দিত। ঈশ্বর চাইলে আমি আমার ছেলেকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখতে যাচ্ছি। আমি তাকে সমর্থন দিতে যাচ্ছি, তাকে শক্তি ও সাহস জোগাতে যাচ্ছি। ম্যাচের পর আমি তাকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরব।’
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে ম্যাচসেরা হওয়ার পর ভোজিনিয়ার আক্ষেপের কথা ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি নজরে আসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিজেরও। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে জেফরিজ নিজেই নিশ্চিত করেন যে, ভোজিনিয়ার মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা ফি মওকুফ করা হয়েছে এবং তার ভ্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে জেফরিজ বলেন, ‘কোনো মায়েরই তার সন্তানকে ইতিহাস গড়তে দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। এটি ঘোষণা করতে পেরে আমি গর্বিত যে ভোজিনিয়ার মা সময়মতো ভিসা পাবেন এবং এই রোববার উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে উপস্থিত থাকতে পারবেন। সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব ফি মওকুফ করা হয়েছে। মা ও ছেলের মিয়ামিতে পুনর্মিলনের জন্য এখন ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
এর আগে, স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর আবেগাপ্লুত ভোজিনিয়া বলেছিলেন, ‘খেলা শেষে আমি কেঁদেছি। ছোটবেলা থেকে দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি, কিন্তু তারা আজ আর বেঁচে নেই। কয়েক বছর আগে দুজনই মারা গেছেন। আর ভিসাজনিত সমস্যার কারণে মা-ও এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন ছিল, সেটাও আমরা জোগাড় করতে পারিনি।’
২০১২ সালে ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ভোজিনিয়া। বর্তমানে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসে খেলেন কেপ ভার্দের এই গোলকিপার। দেশের হয়ে ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নেমে তিনি আরেকটি ইতিহাসও গড়েন। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে তিনি কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানো এই গোলরক্ষক বলেন, ‘আমি ২৫ বছর বয়সে, ২০১২ সালে পেশাদার ফুটবল শুরু করি। আমার মতো একজন মানুষের জন্য সেটি অনেক দেরিতে ছিল। আমি জাতীয় দল ছাড়ার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু এই স্বপ্নের জন্য শেষ পর্যন্ত চালিয়ে গেছি।’
আগামী রোববার (বাংলাদেশ সময় সোমবার) গ্রুপ ‘এইচ’-এ নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে কেপ ভার্দে। পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে মায়ামির সেই মাঠের দিকে। গ্যালারিতে মায়ের উপস্থিতি ভোজিনিয়ার জন্য হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ভোজিনিয়া এবার উরুগুয়ের বিপক্ষে নতুন কোনো রূপকথা লিখতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।












