স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ১৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। শুক্রবারও (১০ জুলাই) আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটিকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী দাবানল হিসেবে দেখা হচ্ছে
আন্দালুসিয়া অঞ্চলের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান আন্তোনিও সানজ জানান, নিহতদের মধ্যে একজন স্প্যানিশ নাগরিক এবং বাকিরা বিদেশি। কর্তৃপক্ষের আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ উপেক্ষা করে তারা গাড়িতে করে এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে আলমেরিয়া প্রদেশের লস গাইয়ারদোস শহরের আশপাশের বনাঞ্চলে তারা আটকা পড়েন।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, লস গাইয়ারদোস জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা হওয়ায় সেখানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি, বিশেষ করে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামের নাগরিক বসবাস করেন। সানজ জানান, একটি গাড়িতে চারজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। আরও সাতজন নিজেদের গাড়ি ফেলে হেঁটে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে তারা নির্ধারিত পথ ব্যবহার না করায় আগুনে প্রাণ হারান।
তিনি বলেন, ‘পরিণতি ভয়াবহ হয়েছে। সবকিছুই ইঙ্গিত করছে যে নিহতদের অধিকাংশ, কিংবা সবাই বিদেশি নাগরিক।’ এই ঘটনা ২০১৭ সালের জুনে প্রতিবেশী পর্তুগালের ভয়াবহ দাবানলের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় তাপপ্রবাহের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আগুনে ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। তাদের অনেকেই গাড়িতে পালানোর সময় আগুনে পুড়ে মারা যান।
মৌসুমের শুরুতেই ভয়াবহ দাবানল
চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকেই একের পর এক তাপপ্রবাহে স্পেনের বিস্তীর্ণ এলাকা শুষ্ক হয়ে পড়েছে। এতে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং আগেভাগেই শুরু হয়েছে দাবানলের মৌসুম। ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্য ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে গেছে। এটি গত দুই দশকের বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির প্রায় অর্ধেক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ বছর আগুনে পুড়ে যাওয়া মোট এলাকার ৪০ শতাংশ।
গত বছর আগস্টের রেকর্ড তাপপ্রবাহে স্পেনে গত তিন দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা যায়। তখন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে যায়, যা লন্ডন শহরের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। সালামাঙ্কার বন দমকলকর্মী রোমান গার্সিয়া বলেন, ‘সাধারণত আগস্টের আগে এমন দাবানল দেখা যায় না। এখন গাছপালা আগেভাগেই শুকিয়ে যাওয়ায় আগুনও আগেই শুরু হচ্ছে।’
নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনরা
নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় অনলাইন ফোরামে নিখোঁজদের খোঁজ চেয়ে বার্তা দিচ্ছেন।
এক নারী জানিয়েছেন, তার মেয়ে একটি লাল রঙের ফোর্ড ফিয়েস্তা গাড়িতে কুকুরসহ নিখোঁজ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তার ভাই ১০ জনের একটি দলের সঙ্গে একটি ঝরনার পাশের উপত্যকা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি উদ্ধারকর্মীদের কাছে নির্দিষ্ট অবস্থানও পাঠিয়েছেন।
প্রতিবেশী আন্তাস শহরের মেয়র পেদ্রো রিদাও জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, বৃহস্পতিবার একটি বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে শুকনো ঝোপে পড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এন্দেসা জানিয়েছে, তাদের প্রকৌশলীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ওই তারে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহ ছিল না।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এই ঘটনায় তিনি অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত। এই দাবানলে প্রাণহানির সংখ্যা ২০০৫ সালের পর দেশটিতে সর্বোচ্চ প্রাণহানি। ওই বছর গুয়াদালাহারা প্রদেশে বারবিকিউ থেকে লাগা আগুনে ১১ জন দমকলকর্মী নিহত হন। সেই ঘটনার পর স্পেনে দাবানল প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছিল।












