কুমিল্লারবিবার, ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের শঙ্কা

প্রতিবেদক
Cumilla Press
জুলাই ১১, ২০২৬ ২:৪৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে কয়েকদিনের টানা বর্ষণে দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।

দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেওয়ার আগেই, গত ২৯ জুন রাঙামাটি জেলা কমান্ড্যান্টের কার্যালয়ে উপজেলা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাতাভোগী ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢালু ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসনের চিহ্নিত করা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে তৎপর হয়ে ওঠেন আনসার ও ভিডিপির তৃণমূল সদস্যরা। চলমান ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই পাহাড়ি জনপদগুলোতে দল বেঁধে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালান তারা।

স্থানীয় প্রশাসন ও উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনায় বাহিনীটির সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে পাহাড় ধসের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে শুরু করেন। একই সঙ্গে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সবাইকে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।

ভারি বর্ষণ শুরু হলে মাঠপর্যায়ে কাজের গতি আরো বাড়িয়ে দেয় আনসার ও ভিডিপি। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে বাহিনীটির সদস্যরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে আনার কাজ শুরু করেন।

ঝড়ো হাওয়া আর কর্দমাক্ত পথ মাড়িয়ে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের পিঠে করে কিংবা হাত ধরে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন উপায়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেন তারা। উপজেলা পর্যায়ে চলমান এই উদ্ধার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সফল করতে নিয়মিত বিরতিতে ভাতাভোগী সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক এবং ব্রিফিং করেন উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তারা, যা মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করেছে।

উদ্ভুত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত ১০ জুলাই বিকেল ৫টায় দেশের সব জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই নির্দেশনার আলোকেই রাঙামাটি জেলা সদরের প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয় এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত নিরাপদেই আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে, তা নিশ্চিত করতে আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা সেখানে দিনরাত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।বিপন্ন মানুষের পাশে থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেই রাত জাগছেন বাহিনীর সদস্যরা।

পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যার চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এখনো যারা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছেন, তাদের জীবন বাঁচাতে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা। তীব্র দুর্যোগের মধ্যেই কাঁধে হ্যান্ড মাইক নিয়ে তারা ছুটে যাচ্ছেন পাহাড়ের পাদদেশে থাকা প্রতিটি ঘরে ঘরে। অনতিবিলম্বে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার জন্য বাসিন্দাদের পুনরায় অনুরোধ ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। জানমালের চূড়ান্ত ক্ষতি এড়াতে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে প্রতিটি মানুষকে সরিয়ে নিতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন আনসার-ভিডিপির মাঠপর্যায়ের সদস্যরা।

যেকোনো ধরনের জরুরি ও আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি বিশেষ টিমও গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে যেকোনো মুহূর্তে যৌথ টহল ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য ‘আনসার ব্যাটালিয়ন’-এর বিশেষ দক্ষ টিমকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেকোনো দুর্গম এলাকায় তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ পরিচালনা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই বিশেষ টিমটি ব্যাকআপ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে, যা স্থানীয় প্রশাসনের দুর্যোগ মোকাবেলা কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করেছে।

রাঙামাটিসহ দেশের সব বন্যা কবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে তাদের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দুর্গত মানুষের উদ্ধার, সতর্কীকরণ এবং সর্বাত্মক সহায়তা করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে ব্যাটালিয়ন পরিচালক, জেলা কমান্ড্যান্ট এবং উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তারা নিজেরা সরাসরি উপদ্রুত এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি ও সমন্বয় করে যাচ্ছেন।

চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষা করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন একতাবদ্ধ। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট মানবিক নির্দেশনা, অন্যদিকে বাহিনীর মহাপরিচালকের আন্তরিক ও মানবিক আহ্বান—এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাহিনীর প্রতিটি স্তরের সদস্য নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন ক্ষণে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি প্রাণও যেন অকালে ঝরে না যায়, সেই লক্ষ্যেই দিনরাত অবিচলভাবে লড়াই করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।