যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের একটি সূত্র। এতে সংঘাত শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের একমাত্র অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পথটি আঘাতের মুখে পড়ে।
একই সূত্র জানায়, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন — যা বর্তমানে দেশটির একমাত্র তেল রপ্তানি পথ —ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আরও কিছু স্থাপনাও হয়ে পড়ে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু।
এই পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ এলাকা থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। পাইপলাইনটি কার্যত সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ‘লাইফলাইন’ হয়ে উঠেছিল। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর উপসাগরে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আটকে যায়, ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
সূত্রটি বলেছে, পাইপলাইনের প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা হচ্ছে। এতে করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর জ্বালানি সংকট হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পুরো অঞ্চলে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইয়ানবুতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর তেল স্থাপনাও রয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
হামলার সঠিক সময়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা পাইপলাইনের কার্যক্রমে এর প্রভাব সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি সরকারের যোগাযোগ দপ্তর এবং পাইপলাইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো ইমেইলে পাঠানো মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ সাময়িকভাবে থামানো। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এবং জ্বালানি বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তবে এই সমঝোতা সত্ত্বেও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে হামলা থামেনি। একদিকে ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে – লেবাননের কয়েকটি অঞ্চলে ১০ মিনিটের মধ্যে ১৬০টি বোমা মেরেছে ইসরায়েল। অথচ ইরানের দিক থেকে যুদ্ধবিরতির শর্তের একটি ছিল লেবাননেও হামলা বন্ধ করা।
ইসরায়েল যখন লেবাননে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ‘মিত্র’দের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান, অন্তত কুয়েত-আমিরাত-বাহরাইনের মতো দেশগুলোর দাবি তা-ই।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টার পর থেকে দেশটিতে ইরানের হামলা আরও জোরদার হয়েছে। ড্রোন হামলায় তেল স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি শোধনাগার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে বাহরাইন বলেছে, ইরানের হামলায় সিত্রা এলাকায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরামকো ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতা দেশীয় ব্যবহারে কাজে লাগায়। এতে রপ্তানির জন্য প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতা থাকে। মার্চের ২৩ তারিখ থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় গড়ে ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়েছে বলে শিপিং তথ্য থেকে জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই পাইপলাইন সৌদি আরবকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছিল। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মার্চ মাসে দেশটির সম্ভাব্য তেল আয়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় বেশি ছিল।














