হামলা-পাল্টা হামলার জেরে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাতের রেশ ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান দাবি করেছে, তারা রাডার কেন্দ্র ও বিমানবন্দরসহ ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, শনিবার (২৮ মার্চ) ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), ইরানি সেনাবাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের মিত্ররা একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসি দীর্ঘ ও মধ্যম পাল্লার কঠিন ও তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েল ও অন্যান্য স্থানে ‘ইসরায়েল-আমেরিকা শত্রুপক্ষের’ বিভিন্ন শিল্প স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানেও আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে ইরানি সেনাবাহিনী ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের সামরিক এয়ারোস্পেস কমপ্লেক্সে অবস্থিত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানি এলটার পরিচালিত একটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও রাডার কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ডেভিড বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্রেও আঘাত হানা হয়েছে।
এদিকে উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানির বাসভবনে ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইআরজিসি। প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে আইআরজিসি এবং এটিকে হত্যাচেষ্টা ও ‘স্পষ্ট সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অতীতেও ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড’ চালিয়েছে এবং এই হামলাও আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা নষ্ট করার অংশ।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি শনিবার সকালে হামলার পর নেচিরভান বারজানির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এ ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই হামলার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি। তবে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী ও কুর্দি বাহিনীর ওপর হামলা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাহরাইনের অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি ‘অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন’ (আলবা) জানিয়েছে, তাদের স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে। এতে দুজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং বারবার সেখানে হামলার সতর্কতা সাইরেন বাজানো হচ্ছে। আবুধাবিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন। ওমানে সালালাহ বন্দরে দুটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর এক মাস পার হলেও হামলার মাত্রা কমার কোনও লক্ষণ নেই। বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
শুধু জ্বালানি নয়, সার সরবরাহও হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ, এশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বহু দেশ তাদের কৃষি খাতে এই সারের ওপর নির্ভরশীল।
এছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ হিলিয়াম কাতার থেকে আসে। এটি এমআরআই মেশিন পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় এই মেশিন অপরিহার্য। সব মিলিয়ে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।












