অধিকাংশ আসনে বিএনপির বিজয়ের পাশাপাশি একাধিক নতুন মুখের উত্থানে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চমকপ্রদ ফলাফল মিলেছে। এছাড়া বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃত প্রার্থীর জয়, রেকর্ড ষষ্ঠবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন ভোট ব্যবধানের লড়াইসহ নানা চমক ছড়িয়ে পড়েছে জেলায়।
অধিকাংশ আসনে বিএনপির বিজয়ের পাশাপাশি একাধিক নতুন মুখের উত্থানে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে ষষ্ঠবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন সাবেক পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে অর্ধ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন রেখেছেন কায়কোবাদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ভোট। তার প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর ইউসুফ সোহেল পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ভোট।
এর আগে কায়কোবাদ ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মুরাদনগরের বাসিন্দারা বলছেন, কায়কোবাদ জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। অতীতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ভোটাররা আবারও তার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আফম তারেক মুন্সী বলেন,“শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ আমাদের নেতা, তিনি সাধারণ মানুষের নেতা। তাই তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে অভিনন্দন জানাই।”
সব কেন্দ্রেই হাসনাত আবদুল্লার জয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সবকয়টি কেন্দ্রেই জয় পেয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
কুমিল্লার এ আসনের শুরু থেকেই হাসনাত আব্দুল্লাহর পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম এই সমন্বয়কের পক্ষে তরুণ প্রজন্মসহ স্থানীয় বিভিন্ন বসয়ী ভোটারদের সমর্থন ছিল চোখে পড়ার মতো।
এবারের নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ আসনটি সারা দেশের মধ্যে অন্যতম আলোচিত আসনে পরিণত হয়েছিল। মাঠে হাসনাতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি। তবে মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ভোটের আগেই মুন্সিকে হারান এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ। ফলে আসনটি বিএনপি প্রার্থীশূন্য হয়ে পড়ে।
পরে লড়াই টিকিয়ে রাখতে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দিলেও তাতে কোনো সুফল পায়নি বিএনপি। শেষ পর্যন্ত ভোপের ব্যালটে জনগণের রায় গিয়েছে হাসনাতের পক্ষেই।
ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, ১১৬টি কেন্দ্রের সব কটিতেই তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে হাসনাত বেশি ভোট পেয়েছেন। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৩। আর জসিম পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৮৫ ভোট। তাদের দুজনের ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি।
বিদ্রোহ, বহিষ্কার ও বিজয়ী
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে ভোটের মাঠে চমক দেখিয়েছেন তরুণ নেতা আতিকুল আলম শাওন। চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রেদোয়ান আহমেদকে ধরাশায়ী করে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছেন তিনি।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেছেন রেদোয়ান আহমেদ। তাকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)।
নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আতিকুল আলম শাওন পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট। আর রেদোয়ান পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট।
বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী জাকারিয়া, কম ভোটে জসিম
কুমিল্লায় বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী জাকারিয়া তাহের সুমন। আর কম ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের জসিম উদ্দিন।
ধানের শীষ প্রতীকে জাকারিয়া মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৭৮ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর শফিকুল আলম হেলাল পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৯১ ভোট। অর্থাৎ জাকারিয়া ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন এর আগে ২০০৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শফিকুল আলম হেলাল এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
জামায়াত প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবচেয়ে কম ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন কুমিল্লা-৫ আসনের বিএনপি মনোনতি প্রার্থী জসিম উদ্দিন। জামায়াত প্রার্থী মোবারাক হোসেনের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান দশ হাজারের কিছু কম।
বিএনপির জসিম উদ্দিন ৯হাজার ৯৩৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫।
আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস ছিল আগে থেকেই। তবে শেষ হাসি হেসেছেন ধানের শীষের প্রার্থী জসিম।
৬ নতুন এমপি, প্রথম নির্বাচন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কুমিল্লা থেকে এবার ছয়জন নতুন মুখ যাচ্ছেন। কুমিল্লা জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ছয়জনই সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথমবার নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন।
প্রথম নির্বাচনেই বাজিমাত করেছেন কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপির অধ্যক্ষ সেলিম ভুইয়া, কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ, কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপি নেতা জসীমউদ্দীন, কুমিল্লা-৭ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃত আতিকুল আলম শাওন, কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম এবং কুমিল্লা- ১০ আসনে বিএনপি নেতা মোবাশ্বের আলম ভাইয়া।
মোবাশ্বের আলম ভুইয়া ২০০৮ সালে নির্বাচন করলেও সে বার হেরে যান।
কুমিল্লার ১১টি আসনের দুটি আসনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে জামায়াত-এনসিপির ১১ দলীয় জোট। একটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হলেও বাকি সব আসনেই প্রত্যাশিত জয় পেয়েছে বিএনপি।
জামানত হারিয়েছেন ৫৯ জন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার ৮৩ জন প্রার্থীর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন ৫৯ জন।
নির্বাআন কমিশনের আরপিও বা জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো আসনে প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ কোনো প্রার্থী না পেলে তার নির্বাচনী জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
ভোটের ৮ শতাংশের কম পেলে মনোনয়নপত্রের সাথে জমা হওয়া ৫০ হাজার টাকা ফেরত পান না প্রার্থী। কুমিল্লা-৫ বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া আসনে ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন।
জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ইনসানিয়াত বিপ্লব- এসব রাজনৈতিক দলের কেউই আসনটিতে প্রদত্ত ভোটের ১ শতাংশও পান নি।












