মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের ওপরও। বিশেষ করে এলএনজি ও এলপিজি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্রিয় হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত পাঁচটি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, যা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ধারাবাহিকভাবে এসব জাহাজ আগমনের ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি খাতে জ্বালানি সংকট কিছুটা লাঘব হবে। এলপিজি মূলত প্রোপেন ও বিউটেন গ্যাসের মিশ্রণ, যা সিলিন্ডারের মাধ্যমে সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় পাইপলাইন সুবিধাবিহীন এলাকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে এলএনজি হলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, যা মূলত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা, টেক্সটাইল ও সিরামিক শিল্পে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
জাহাজ আগমনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ২ হাজার ৪৭০ টন এলপিজি নিয়ে ‘মর্নিং জেলি’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৬৯ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘ইএমইআই’ নামের আরেকটি জাহাজ মহেশখালীর ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) ভিড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পরদিন ১১ এপ্রিল একই উৎস থেকে প্রায় সমপরিমাণ এলএনজি নিয়ে ‘কংটং’ নামের আরও একটি জাহাজ ওই টার্মিনালে পৌঁছাবে।
এছাড়া ১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে এলপিজি বহনকারী ‘পল’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসবে। সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রায় ৬৪ হাজার ৬৭৮ টন এলএনজি নিয়ে ‘ম্যারান গ্যাস হাইড্রা’ নামের জাহাজটির দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব জাহাজের আগমন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেয়া হচ্ছে, যাতে দ্রুত খালাস কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়। এর আগে ৮ এপ্রিল রাতে মালয়েশিয়া থেকে ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে ‘এমটি সেন্ট্রাল স্টার’ নামের একটি ট্যাংকার বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে এবং পরদিন পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে নোঙর করার পর খালাস কার্যক্রম শুরু হয়। একই সময়ে ‘ইস্টার্ন কুইন্স’ নামের আরেকটি ট্যাংকার উচ্চ সালফারযুক্ত ফুয়েল অয়েল নিয়ে বন্দরে আসে।
এদিকে এপ্রিল মাসের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া থেকে দুই দফায় মোট প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের বেশি এলএনজি দেশে পৌঁছেছে, যা বিদ্যমান জ্বালানি সংকট কিছুটা কমাতে সহায়তা করেছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে মোট ৯টি এলএনজি জাহাজ দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি জাহাজ পৌঁছেছে এবং সেগুলোর গ্যাস খালাস প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিটি জাহাজে গড়ে ৬৯ থেকে ৭০ হাজার টন এলএনজি বহন করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, ধারাবাহিক জ্বালানিবাহী জাহাজ আগমনের ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পখাত এবং গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল থাকলে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা গেলে আগামী মাসগুলোতে জ্বালানি পরিস্থিতি আরও উন্নত হতে পারে।


কুমিল্লা প্রেস সংবাদ দেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সাবস্ক্রাইব করে কুমিল্লা প্রেসের সাথেই থাকুন।












