শরীয়তপুরে আবারও হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের নৈরাজ্যে প্রাণ হারালেন এক মুমূর্ষু রোগী। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ঘটনা। সিন্ডিকেটের বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেয়ায় বাধা, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এতে দেড় ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি এবং সড়কেই মৃত্যু হয় এক হৃদরোগীর।
নিহত হৃদরোগীর নাম জমশেদ ঢালী (৭০)। মঙ্গলবার সকালে গুরুতর অবস্থায় তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে ঢাকায় রেফার্ড করেন। স্বজনরা হাসপাতাল চত্বরে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে ৬ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া চুক্তি করলেও রোগী তোলার পর অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। বাড়তি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্বজনরা বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বাইরে থেকে ৫ হাজার টাকায় অন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হাসপাতালকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা যাওয়ার পথে অন্তত দুই স্থানে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি জোরপূর্বক আটকানো হয়। মানিক, সুমন, পারভেজ, সজিবসহ ৭-৮ জন মিলে বাধা দেন। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই সড়কেই মারা যান জমশেদ ঢালী।
নিহতের নাতি জোবায়ের হোসেন বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি- রোগী খুবই আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে। কিন্তু তারা টাকার কথা ছাড়া কিছুই শোনেনি। প্রথমে সাড়ে ছয় হাজার টাকা যুক্তিতে ভাড়া করলেও পরে সাড়ে সাত হাজার টাকা দাবি করে। আমরা বিকল্প অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া আনলেও রোগী তুলতে বাধা দেয়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় রোগী নিয়ে ঢাকায় রওনা করলে দুই জায়গায় বাধা দিয়ে দেড় ঘণ্টা আটকে রাখে আমাদের। যদি সময়মতো যেতে দিতো, তাহলে হয়তো মানুষটা বেঁচে যেত।
অ্যাম্বুলেন্সচালক মো. সালমান জানান, জোর করে গাড়ি থামিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। আমার গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নিয়েছে। পথের মধ্যে দুইবার আটকা পড়ায় নির্ধারিত সময়ে রোগী নিয়ে ঢাকা যেতে পারিনি। সিন্ডিকেটের বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সের ওরা হাসপাতাল থেকে রোগী তুলতে দেয় না। আমি রোগী নিয়ে ঢাকা রওনা দিলে আমার ওপর চড়াও হন চক্রের সদস্যরা।
এটাই প্রথম ঘটনা নয়। গত বছরের ১৪ আগস্ট একই সিন্ডিকেটের বাধায় প্রায় ৪০ মিনিট সড়কে আটকে থেকে প্রাণ হারায় এক নবজাতক। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর আলোচনা সমালোচনার মুখে কিছুদিন বন্ধ থাকে সিন্ডিকেট চক্রের তৎপরতা। সময়ের ব্যবধানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র।
স্থানীয় আইনজীবী মাসুদুর রহমান বলেন, অ্যাম্বুলেন্স যদি ব্যবসার হাতিয়ার হয়, তাহলে গরিব মানুষের জীবন নিরাপদ নয়। গতবছরও তারা একই ঘটনা ঘটিয়েছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ করে তাদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে ভবিষ্যতে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
শরীয়তপুর জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, কিছু অসাধু লোকের কারণে পুরো সেক্টর বদনামের শিকার হচ্ছে। গত রাতের ঘটনাটি একেবারেই কাম্য ছিল না। যারা যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি।
শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের সরাসরি শাস্তিমূলক ক্ষমতা নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবো।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হোসেন জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বন্ধ করতে স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ এবং পুলিশের সমন্বয়ে যৌথভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।












